Madhyamaheshwar Kedar kshetra in Bengali - Esso Pori- Read Now

Latest

শনিবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩

Madhyamaheshwar Kedar kshetra in Bengali

   পঞ্চ কেদার পর্ব -02

           পঞ্চ কেদার তীর্থ ক্ষেত্র পরিক্রমা।

Madhyamaheshwar Kedar kshetra in Bengali

   মধ্যমহেশ্বর বা মধমহেশ্বর কেদার ক্ষেত্র।


    পঞ্চ কেদার খণ্ডের ণ্বিতীয় পর্ব


  সনাতন হিন্দু ধর্মে হিমালয়ের অত্যুচ্চ শিখর সমূহে অবস্থিত শৈব তীর্থক্ষেত্রগুলির মধ্যে উত্তরাখণ্ড রাজ্যের পঞ্চ কেদার তীর্থ বিশেষভাবে উল্লেখের দাবী রাখে।


  অষ্টম শতাব্দীর আধ্যাত্মবাদী সন্ত আদি শঙ্করাচার্য নির্দেশিত পঞ্চ কেদার তীর্থ পরিক্রমার দ্বিতীয় কেদার মধ্যমহেশ্বর বা মধমহেশ্বর বা মদমহেশ্বর হলেও পরিক্রমণের ক্ষেত্রে এটি চতুর্থ কেদার হিসাবে বিবেচিত হয়।


    * মধ্যমহেশ্বর কেদার ক্ষেত্রের অবস্থান।


   মধ্যমহেশ্বর মন্দিরটির দক্ষিণ পার্শ্বে রয়েছে, এক রহস্যময়তায় ঘেরা গিরিরাজ হিমালয়ের বরফাবৃত শিখরসমূহ ও বাম পার্শ্বে গভীর অরন্যানীর পটভূমিকায় বিস্তৃত সবুজ গালিচার মতো নয়নমুগ্ধকর পার্বত্য উপত্যকার তৃণভূমি, যা একাধারে তীর্থের পূণ্য ও ভ্রমণের সাধ পূর্ণ করে।


  হাজার বছরের প্রাচীন মধ্যমহেশ্বর মন্দিরসহ সম্পূর্ণ গ্রামটি তার গ্রাম্য বাড়িঘর নিয়ে পার্বত্য পরিবেশে যেন একটি ছবির মতো বিরাজমান।


  মধ্যমহেশ্বর কেদার ক্ষেত্রের অবস্থান সমুদ্র পৃষ্ঠতল থেকে 3497মি/11,473ফুট উচ্চতায় উত্তরাখণ্ড রাজ্যের গাড়োয়াল হিমালয়ের গাউনদার(Gaundar) গ্রামে ও এখানে পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে,  মহাদেবের উদরাংশ তথা নাভিস্থল পূজিত হয়।

   

     * পঞ্চ কেদার সৃষ্টির সংক্ষিপ্ত পৌরাণিক ব্যাখ্যা।


  দ্বাপর যুগে মহাভারতের কাহিনী অনুসারে পাণ্ডব ও কৌরবগণের ম্যধ্যে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে জ্ঞাতি ভ্রাতা ও কৃপ, দ্রোণ প্রভৃতি ব্রাহ্মণগণকে হত্যা করার মহাপাপ থেকে মুক্তিলাভের উপায় স্বরূপ মহর্ষি ব্যাসদেব পাণ্ডবগণকে কাশীধামে গিয়ে মহাদেবের তপস্যা করার বিধান দেন।


  তদনুসারে, পঞ্চপাণ্ডব তাঁদের উত্তরাধিকারীদের হস্তে রাজ্যভার অর্পণ করে কাশীধামে উপস্থিত হন, কিন্তু মহাদেব পাণ্ডবগণের এবম্বিধ অন্যায় যুদ্ধে কৃত  মহাপাপ ক্ষমা না করার জন্য কাশী থেকে পালিয়ে হিমালয়ের এক গোপন স্থানে যা বর্তমানে মহাদেবের লুকিয়ে থাকার জন্য গুপ্তকাশী নামে পরিচিত, সেখানে বৃষরূপী নন্দী হয়ে অবস্থান করতে থাকেন।


  পাণ্ডবগণ কাশীতে মহাদেব নাই জানতে পেরে তাঁর সন্ধানে হিমালয়ের ঐ স্থানে এসে  মহাদেবের উপস্থিতি বুঝতে পারেন ও মধ্যম পাণ্ডব ভীম দুই পর্বত শিখরে দুই পা দিয়ে খুঁজতে গিয়ে নন্দীরূপী বৃষকে তৃণ ভক্ষনরত অবস্থায় দেখে তার পশ্চাতের দুই পা ও লেজ সজোরে চেপে ধরলে মহাদেব পাঁচটি খণ্ডে বিভক্ত হয়ে ভূমিতে বিলীন হন ও পাঁচটি পর্বতে পুনরাবির্ভূত হন, যা পরবর্তীকালে পঞ্চ কেদার হিসাবে গড়ে ওঠে।


  পাণ্ডবগণ ঐ পাঁচটি স্থানে পাঁচটি মন্দির গড়েন ও কেদারনাথে তপস্যা ও যজ্ঞ করে পাপ মুক্ত হন এবং সেখান থেকে মহাপ্রস্থানের পথে(পথটি মহাপন্থ বা স্বর্গারোহিনী নামেও পরিচিত) স্বর্গে গমণ করেন।


  কথিত আছে, মধ্যম পাণ্ডব ভীম এই মধ্যমহেশ্বর মন্দিরে শিবের তপস্যা করে পাপ মুক্ত হন।


            * মধ্যমহেশ্বর মন্দির, দেবদেবী ও  পূজার্চনা।


  গাড়োয়াল হিমালয়ের এক উচ্চ পর্বত শিখরে মধ্যমহেশ্বর মন্দিরের অবস্থানের কারণে এলাকাটি শীতকালে বরফাবৃত থাকায় স্বাভাবিকভাবেই দেবতার পূজা প্রকরণ চালানো সম্ভব হয় না এবং সমগ্র শীতকাল মন্দির বন্ধ থাকে।


  প্রতি বার মন্দির বন্ধ থাকার ও খোলার দিন পরিচালকগণের পূর্ব ঘোষণামত দুর্গোৎসবের শেষ দিন বিজয়া দশমী বা দশেরার দিন হয়ে থাকে, যা প্রধানত ছয় মাস নভেম্বর - এপ্রিল মাস পর্যন্ত বন্ধ থাকে এবং ঐ সময় বিশেষ উপায়ে প্রভূর প্রতীকী মূর্তি অপেক্ষাকৃত নিম্ন উচ্চতার উখীমঠে নামিয়ে এনে সেখানেই যথাবিহিত পূজার্চনা করা হয়।


   মন্দির খোলার আগে 16-24শে মে, ওঙ্কারেশ্বর মন্দির উখীমঠ থেকে প্রভূর প্রতীক নিয়ে মহসমারোহে ডোলির যাত্রা শুরু হয় এবং প্রথম বিরাম স্থল রাঁশি গ্রামে রাকেশ্বরী মন্দিরে যথাবিহিত প্রচলিত পদ্ধতি অনুসারে প্রভূর পূজা করা হয়।

  

  এরপর সেই ডোলি গাণ্ডার গ্রামে পৌঁছায় ও সেখানে দেবতা এক রাত্রির জন্য বিশ্রাম গ্রহণ করেন এবং পরদিন মন্দিরের পুরোহিতগণ যথাবিহিত পূজাপাঠ ও নিয়মবিধি পালনের মধ্যে দিয়ে প্রভূর মন্দিরের দরজার অর্গল মুক্ত করেন।


  প্রচলিত প্রবাদ অনুসারে মধ্যমহেশ্বর মন্দির সংলগ্ন এলাকার জল এতটাই পবিত্র যে মাত্র কয়েক বিন্দু মস্তকে ধারণ করলেই পূণ্যস্নানের ফল লাভ হয়।


  উত্তরাখণ্ডের অন্যান্য মন্দিরের ন্যায় মধ্যমহেশ্বরের পূজারীগণও কর্ণাটক রাজ্যের মহীশূর অঞ্চলের 'লিঙ্গায়ৎ' জাতির ব্রহ্মণরাই হন, যাদেরকে এখানে 'জঙ্গমস্' বলা হয়, যার ফলে, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় আচার-আচরণকে দেশের মধ্যে বিস্তারিত হয়।


  এই ধর্মীয় আদান -প্রদানের বিধিটি প্রধানত একটি শাস্রীয় নীতি, যাকে "পঞ্চস্থলী নীতি" বলাহয়, সেটি যে পাঁচটি স্থানভিত্তিক নীতি হিসাবে গড়ে উঠেছে তাহল,  বিভিন্ন ধর্মস্থানের 1) গড়ে ওঠা রীতির সংযোগ, 2) দেবতাকে দানের উপকরণ সম্পর্কে ধারণা, 3) ভক্তদের কৃত স্তব রীতি, 4) মেলা ও উৎসব এবং 5) দেবতার কাছে ভক্তের প্রার্থনার ধরণ সম্বন্ধে একটা সার্বিক ধারণা লাভ।


  প্রাচীন একটি ছোট্ট শিব মন্দির বর্তমান মন্দির থেকে 2কিমি দূরে অবস্থিত, যাকে "বৃদ্ধ মধ্যমহেশ্বর" বলা হয় অবশ্য সেখানে যেতে গেলে ট্রেকিং করে বিস্তীর্ণ তৃণভূমি ও  উপত্যকা পার হয়ে, ঐ দুই কিমি খাড়াই পথ অতিক্রম করতে হবে।


   অবশ্য ঐস্থানে একটি ছোট্ট লেক(lake) রয়েছে এবং সেখান থেকে গাড়োয়াল  হিমালয়ের চৌখাম্বা(আক্ষরিক অর্থ চার স্তম্ভ/four pillars) ইত্যাদি বিডিন্ন গিরিশৃঙ্গের অপরপ সৌন্দর্য উপভোগ করা যাবে যা অবর্ণনীয়।


  বর্তমান মন্দিরের গর্ভগৃহে মহাদেবের পেট তথা নাভিস্থল আকৃতির কালো কষ্টিপাথরের শিব লিঙ্গ পূজিত হয় ও কিছু দূরে ছোট আকৃতির দুটি মন্দিরের একটিতে দেবী পার্বতী এবং অপরটিতে পার্বতী ও মহেশ্বরের মিলিত রূপ "অর্দ্ধনারীশ্বর" মূর্তি পূজিত হয়।


  মূল মন্দিরের ডান পাশে একটি ছোট মন্দিরে বিদ্যার দেবী সরস্বতীর মার্বেল পাথরের নির্মিত প্রতিমার পূজা করা হয়।


  * মধ্যমহেশ্বর মন্দিরের ভৌগলিক অবস্থান।

  

  গিরিরাজ হিমালয়ের অত্যুচ্চ পর্বত শিখরের নিম্নে এক বিস্তীর্ণ সবুজ উপত্যকার মধ্যে অবস্থিত মধ্যমহেশ্বর মন্দিরটি রয়েছে কেদার পর্বতের সুউচ্চ প্রাচীর বেষ্টনীর মধ্যে ও এই পর্বত শৃঙ্গে রয়েছে কয়েকটি হিমবাহ, যেগুলি থেকে মন্দাকিনী নদীর উৎপত্তি হয়েছে।


  * মধ্যমহেশ্বর তীর্থ ট্রেকিং রুট(trekking route)।


  উত্তরাখণ্ডের রুদ্রপ্রয়াগ জেলায় অবস্থিত মধ্যমহেশ্বরর মন্দিরটি যেহেতু হিমালয় পর্বতের এক উচ্চ চূড়ায় অবস্থিত, তাই কিছুটা পথ গাড়িতে গেলেও প্রায় 16কিমি - 18কিমি পথ ট্রেকিং করে অবশ্যই যেতে হবে।


  উখীমঠ থেকে আখতালিধার/রাঁশি(Akhtalidhar/Ransi), যেস্থান থেকে প্রকৃত ট্রেকিং পথ শুরু হয়, তার দূরত্ব প্রায় 22/24কিমি এবং মাঝে গোউন্দার গ্রাম  6কিমি,আর এই গ্রামে কয়েকটি ছোট চটিতে বিশ্রাম করা যাবে।


  এরপর বানতোলি 2কিমি,আর এই বানতোলিতেই রয়েছে সরস্বতী গঙ্গা ও মোরখণ্ডা গঙ্গার মিলনস্থল এবং তার মিলিত রূপ মধ্যমহেশ্বর গঙ্গা তথা মধূগঙ্গার  উৎপত্তিস্থল।

  

  বানতোলি অবধি ট্রেকিং খুব একটা কষ্টসাধ্য না হলেও তারপরের অংশ বেশ খাড়া চড়াই, এরপর, খাতারা, নানু, মাইখাম্বাচট্টি, কুনচট্টি ও তার পর মধ্যমহেশ্বর শৈব কেদার ক্ষেত্রে পৌঁছানো যায়।


  মধ্যমহেশ্বর যাত্রপথে, ঋষিকেশ থেকে কালীমঠ যা "সিদ্ধ পীঠ" হিসাবে বহু ভক্তকে আকর্ষণ করে এবং এখানে দেবী মহাকালী, মহালক্ষ্মী, ও মহাদেব এবং কালভৈরবের মন্দির রয়েছে, তার দূরত্ব 196কিমি/121.8মা এবং এই কালীমঠে নবরাত্রি মহাসমারোহ প্রতিপালিত হয়।


                    * কি ভাবে যাবেন।


   ট্রেকিং পথের বিবরণ, আগেই দেওয়া হয়েছে(ব্লগটি দ্রষ্টব্য), এছাড়া উল্লেখ্য কয়েকটি জ্ঞাতব্য বিষয় :-


   # বিমান পথ :- নিকটবর্তী বিমান বন্দর দেরাদুনের জলি গ্রাণ্ট বিমান বন্দর থেকে উখীমঠ দূরত্ব 235কিমি, সেখান থেকে রাঁশি ট্যাক্সি পাওয়া যাবে।


  # রেল পথ :- নিকটবর্তী রেল স্টেশন হরিদ্বার, দূরত্ব 202কিমি ও সেখান থেকে বাস বা ট্যাক্সি যোগে উখীমঠ ও রাঁশি।


  # সড়ক পথ :- রাঁশি পর্যন্ত যানবাহন চললেও তারপর হাঁটাপথ।


   * কয়েকটি জ্ঞাতব্য বিষয় :-

  1) রাঁশি গ্রাম থেকে ট্রেকিং শুরু।

  2) মিউল(mule) ও ভারবাহকের সাহায্য রাঁশি থেকে পাওয়া যাবে।

  3) শীতকালে প্রচুর বরফপাতের কারণে ট্রেকিং সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে।

  4) উপযুক্ত পোষাক থাকা প্রয়োজন।


    *  দর্শনীয় স্থান :- ক) কাঞ্চনীতাল খ) পাণ্ডুসেরা ও গ) নন্দীকুণ্ড। স্থানগুলি ট্রেকিং গ্রেড - ডিফিকাল্ট(Trekking grade - difficult)।


  সুধী পাঠকবৃন্দ! আশা করি লেখাটি আপনাদের ভালো লেগেছে। পরবর্তী লেখা, পঞ্চ কেদার তীর্থ পর্ব - 3 । ব্লগটির প্রতি লক্ষ্য রাখুন, লেখাটি বেশি বেশি শেয়ার করুন ও কমেন্ট করুন। ধন্যবাদ।