Temple of Goddess Kanak Durga - Esso Pori- Read Now

Latest

শনিবার, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩

Temple of Goddess Kanak Durga

 Temple of Goddess Kanak Durga,

  Guptamoni, Rajabandh, P.S. - Jamboni, District - Jhargram, West Bengal - 721513, India.

  মাতা গুপ্তমণি কনক দুর্গা মন্দির।
  গুপ্তমণি, রাজাবাঁধ, পি এস - জামবনি, জেলা - ঝাড়গ্রাম,
পশ্চিম বঙ্গ - 721513, ভারত।

  

  প্রাচীন ভারতবর্ষ তথা বঙ্গদেশের বিভিন্ন প্রান্তে হিন্দু ধর্মের বহু ঐতিহ্যপূর্ণ মন্দিরের সন্ধান পাওয়া যায়, যা বর্তমান আধুনিকতার আলোকে বিচার করলে, বিস্মিত হতে হয়।

  হিন্দু ধর্মের প্রাচীন রীতি অনুসারে হিন্দু দেবদেবীগণের পূজার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ব্রাহ্মণ জাতির ব্যক্তিগণেরই একমাত্র অধিকার, আর কারও রীতি অনুযায়ী মন্ত্রোচ্চারণ ও পূজার অধিকার নাই।

  ভারতবর্ষের বিভিন্ন মন্দিরে কোথাও কোথাও ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায় না যে তা নয়, তবে তা নিয়ম হিসাবে মানা হয় না।

  আজ আমরা এমনই একটি প্রায় সাড়ে চারশো বছর পূর্বের এক ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রের কথাই এখানে আলোচনা করব।

   * রাজা গোপীনাথ গজমত্ত সিংহ চিল্কিগড়ের রাজা।

  পশ্চিম বঙ্গে অবিভক্ত পশ্চিম মেদিনীপুরের ঝাড়গ্রাম মহকুমা, বর্তমানে নবতম এক অরণ্য বেষ্টিত জেলা ও তার সদর শহর হিসাবে ঝাড়গ্রাম, আজ আধুনিকতার ছোঁয়ায় সমৃদ্ধ হয়েছে।

  প্রায় 450 বছর পূর্বে প্রাচীন চিল্কিগড়ের রাজা গোপীনাথ গজমত্ত সিংহের রাজপ্রাসাদ এক গভীর জঙ্গলাকীর্ণ ছিল ও প্রজারা ছিল অধিকাংশই মূলবাসী।

  রাজ্যের সুরক্ষা ও সংগৃহীত রাজস্ব নিরাপদ রাখার জন্য তিনি গোপনে গভীর জঙ্গলের মধ্যে দীর্ঘ সুড়ঙ্গপথ খনন করেন, যা এলাকার লোকেরও অজ্ঞাত ছিল।

  রাজা শত্রুপক্ষের সঙ্গে যুদ্ধের সময় ঐ সুড়ঙ্গপথে আত্মগোপন করে, গেরিলা কায়দায় অতর্কিত আক্রমনে তাদের পরাজিত করতেন এবং এই জাতীয় বহু যুদ্ধে তিনি জয়লাভও করেন।

  তাঁর রাজ্য প্রধানতঃ মূলবাসী "শবর" "লোধা" প্রভৃতি জাতি অধ্যুষিত ছিল এবং তাদের এক মোড়ল বা প্রধান ছিলেন নন্দ ভক্ত।

  নন্দ ভক্ত একদিন গরু ও মহিষ চরাবার সময় ঐ পূর্বোল্লিখিত সুড়ঙ্গপথটি আবিস্কার করে ফেলেন এবং তাঁর পরিবারের লোকদের কাছে সেকথা প্রকাশ করে দেন।

  রাজার প্রিয় হস্তীর নাম ছিল 'গজ', যেটি কয়েকদিন যাবৎ নিখোঁজ ছিল এবং সেটিকে নন্দ ভক্ত গোচারণকালে দেখতে পান, যে সেটি সেই সুড়ঙ্গের কাছে লতাপাতা দিয়ে বাঁধা আছে ও তাকে কিছু শাক-পাতা খেতে দেওয়া হয়েছে।

  এখানেই এই কাহিনীর এক বিশাল মোড় ঘুরে যায়।

      * রাজা ও নন্দ ভক্তের স্বপ্ন দর্শন।

  সেই সময় রাজা গোপীনাথ গজমত্ত সিংহ এক স্বপ্নে দেবী দুর্গার স্বপ্নাদেশ লাভ করেন যে, শবর প্রধান নন্দ ভক্তকে তিনি যেন তাঁর হস্তী 'গজ'কে খুঁজে দিতে আদেশ দেন এবং পরদিন রাজা তাই করেন।

  অপরদিকে, নন্দ ভক্তও এক স্বপ্নাদেশ পান, যেখানে দেবী দুর্গা নন্দের হাতে পুজা পাবার আকাঙ্খা প্রকাশ করেছেন।

  রাজার আদেশে নন্দ তাঁকে সেই সুড়ঙ্গের কাছে নিয়ে যান ও সেখানে এই স্বপ্নাদেশের কথা বলেন।

রাজা বুঝতে পারেন যে দেবী দুর্গা সেই সুড়ঙ্গ পথের নিকটে শবর প্রধানের হাতে পূজা পাবার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, তাই তাঁর প্রিয় হস্তী 'গজ' কে ঐস্থানে বেঁধে রেখে শবর প্রধানকে দিয়ে তার সন্ধান দিলেন।

  রাজা তাঁর গজকে ফিরে যেতে বললে সে রাজী হয়নি, কিন্তু তিনি ঐ স্থানে দেবী দুর্গার পূজা করবেন বলে ত্রিসত্য করার পর সে ফিরে যেতে রাজী হয়।

  রাজা তাঁর মন্ত্রীকে ঐ জায়গায় একটি মন্দির নির্মানের আদেশ দেন ও সেই মন্দিরে শবর প্রধানদের দ্বারা দেবী দুর্গা আজও পূজিতা হন।

   * গুপ্তমণি কনক দুর্গা মন্দির।

  ভেষজ অরণ্য বেষ্টিত অপরূপ প্রাকৃতিক পরিবেশে ও নাম-না-জানা পক্ষীকুলের কলতানে মুখরিত নির্জন ও ছিমছাম পরিচ্ছন্নতার মধ্যে দেবী কনক দুর্গা মন্দিরের আধ্যাত্মিক পূজার্চনার ক্ষেত্র হিসাবে এই চিল্কিগড় এক আদর্শ স্থান।

  রাজা গোপীনাথ সিংহ নির্মিত প্রাচীন মন্দিরটি বর্তমানে ভগ্ন অবস্থায় পরিত্যক্ত হয়েছে, কারণ হিসাবে জনশ্রুতি আছে যে, মন্দিরটির উপর বজ্রপাত হওয়ায় সেটি দুভাগে বিভক্ত হয়ে যায়।

  বর্তমানের মন্দিরটির বামপার্শ্বে সেই মন্দিরটি  উড়িষ্যা স্থাপত্য রীতিতে নির্মিত হয়েছিল ও তার শীর্ষদেশে একটি 'বিষ্ণু চক্রে'র অবস্থান ভগ্ন মন্দিরটিকে প্রাচীন বিষ্ণু মন্দির হিসাবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

  * মাতা বন দুর্গা বা বন দেবী বা কনক দুর্গা।

  প্রাচীন মন্দিরে স্থানীয় রাজাদের প্রদত্ত একটি স্বর্ণ নির্মিত দুর্গা দেবীর মূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, কিন্তু 1903-1907 সালের মধ্যে সেই কনক দুর্গা মূর্তি চুরি হয় ও তারপর একটি কষ্টিপাথরের মূর্তি মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত হয়।

  সেইহেতু এই মন্দিরটিকে কনক দুর্গা মন্দির বা বন দুর্গা বা বনদেবী মন্দির নামেও অভিহিত করা হয় এবং বর্তমানে দেবীকে রাজবাড়ি প্রদত্ত বিবিধ স্বর্ণালঙ্কারে সজ্জিত করা হয়।

  আজও আমাদের আলোচ্য এই কনক দুর্গা মন্দিরে কোন ব্রাহ্মণ পুরোহিত নয়, প্রাচীনকালের প্রথা অনুযায়ী 'শবর', 'লোধা' শ্রেণীর পুরোহিত বংশের পৌরহিত্যে দেবীর পূজাপাঠ হয়ে থাকে।

  দুর্গা পূজার রীতি অনুযায়ী যে চণ্ডীপাঠ করা হয়, তা এখানে করা হয় না।

  কথিত আছে, প্রাচীনকালে দেবী দুর্গার নিকট নরবলি দেওয়া হত ও বলির সেই বেদী ও যূপকাষ্ঠ আজও কিছুদূরে দেখা যায়।

  কনক দুর্গা মন্দিরের পাশ দিয়ে ডুলুং এই মিষ্টি নামের এক ছোট্ট নদী, মালভূমি অঞ্চলের স্রোত চপলতা নিয়ে যেন সুরেলা ছন্দে নেচে নেচে প্রবাহিত হচ্ছে।

  ভ্রমনার্থীগণ জঙ্গলাকীর্ণ এক পরিবেশে, পাখীর কলকাকলিতে মুখরিত পরিবশে চড়ুইভাতির অবকাশের ভিতর, সেই নদীতে নৌকাবিহারও করতে পারেন।
 
  ** তবে লাইফ জ্যাকেট ব্যতিরেকে কখনই নয়।

  ** মন্দির এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশে হনুমান প্রজাতির উৎপাত সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরী।

  ** পরিবার পরিজন সহ, একদিনের ভ্রমণ, পিকনিক ও প্রাচীন মন্দির দর্শনের জন্য গুপ্তমণি কনক দুর্গা মন্দির এক আদর্শ স্থান হতে পার।

            * কিভাবে যাবেন :-

  * বিমানপথ:- কলকাতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঝাড়গ্রাম 178কিমি।

  * রেলপথ ও সড়কপথ :- হাওড়া রেলস্টেশন থেকে দ্রুতগতির ট্রেনে, ভায়া খড়্গপুর, ঝাড়গ্রাম ও সেখান থেকে গুপ্তমণি মন্দির সড়কপথে মাত্র 26কিমি।  খড়্গপুর রেল স্টেশন থেকে মন্দির সড়কপথে দূরত্ব মাত্র 20কিমি।

  * দর্শনীয় স্থান :-

  1) ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি(1931 সালে রাজা নরসিংহ মল্লদেব ঝাড়গ্রামে যে রাজবাড়ি নির্মাণ করেন, সেটি এখনও এখানকার মূল আকর্ষণ) 2) চিল্কিগড় রাজবাড়ি 3) মন্দির সংলগ্ন এলাকায় শিশু উদ্যান, 4) ভেষজ উদ্যান 5) চিল্কিগড় লেক(ঝাড়গ্রাম থেকে 14কিমি দূর), 6) গোপীবল্লভপুর ইকো পার্ক, 7) তারফেনী ব্যারেজ (বেলপাহাড়ি থেকে 7কিমি) ও কিছু প্রাকৃতিক ঝর্ণা ইত্যাদি।

  সুধী পাঠকবৃন্দ! আশাকরি লেখাটি আপনাদের ভালো লেগেছে। ভালো লাগলে, পরিচিতজনদের কাছে শেয়ার ও কমেন্ট করুন। ধন্যবাদ।