Tungnath shiva temple in Bengali. - Esso Pori- Read Now

Latest

রবিবার, ১৯ মার্চ, ২০২৩

Tungnath shiva temple in Bengali.

      

              Tungnath shiva temple in Bengali

        পঞ্চ কেদার শৈব তীর্থ পরিক্রমা

     

                    তুঙ্গনাথ শিব মন্দির

             (পঞ্চ কেদার খণ্ডের তৃতীয় পর্ব)


  ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত শৈব যারা প্রভূ মহাদেবের ভক্ত, শাক্ত যারা দেবী কালিকার ভক্ত,  বৈষ্ণব যারা প্রভূ নারায়ণের ভক্ত ও অন্যান্য যেমন, বৌদ্ধ, জৈন প্রভৃতি তাঁদের সকল ধর্মাবলম্বীগণের ধর্মাচরণের নিমিত্ত বহু সংখ্যক মন্দির, মঠ, গুম্ফা ইত্যাদি ছড়িয়ে রয়েছে।


  ভারতবর্ষের মধ্যে উত্তরাখণ্ড রাজ্যটি আকৃতিগতভাবে ক্ষুদ্র হলেও দেবাদিদেব মহাদেবের আবাসস্থল হিসাবে ও বহুসংখ্যক তীর্থক্ষেত্রের অবস্থিতি অনুসারে বিশেষ উল্লেখযোগ্য স্থান হিসাবে পরিচিত।


  হিন্দু ধর্মাবলম্বীগণের সেই শৈব তীর্থক্ষেত্র সমূহের মধ্যে পঞ্চকেদার, বিশেষ ভাবে পরিক্রমণের কথা আধ্যাত্মবাদী সন্ত আদি শঙ্করাচার্য উল্লেখ করেছেন।


  আমরা এই ব্লগে পূর্বেই জানিয়েছি যে, পঞ্চ কেদার তীর্থক্ষেত্র সমূহের বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করব ও সেই অনুসারে প্রথম কেদারনাথ ধাম পরিক্রমা পর্ব -1 ও দ্বিতীয় মধ্যমহেশ্বর পরিক্রমা পর্ব - 2 ইতিপূর্বে প্রকাশিত হয়েছে এবং আজ আজ তৃতীয় পর্ব তুঙ্গনাথ পর্ব-3 যেখানে তুঙ্গনাথ শিব মন্দির কেদারক্ষেত্র অবস্থিত, সে সম্পর্কে আলোচনা করব।


  উত্তরাখণ্ডে পঞ্চ কেদার শিব মন্দির সমূহ এবং পৃথিবীর মধ্যে উচ্চতম স্থানে অবস্থিত শিব মন্দিরগুলির মধ্যে অন্যতম ও পঞ্চ কেদার তীর্থ ক্ষেত্রের মধ্যে তীর্থ পরিক্রমা পর্যায়ে, তুঙ্গনাথ শিব মন্দির কেদার ক্ষেত্র তৃতীয় স্থানে অবস্থিত।


   উত্তরাখণ্ডের রুদ্রপ্রয়াগ জেলায় শৈবতীর্থ তুঙ্গনাথ মন্দিরটি অলকানন্দা ও মন্দাকিনী নদী উপত্যকার একটি পর্বত ও তুঙ্গ অর্থে উচ্চতম পর্বত শিখরের নাথ তথা প্রভূ মহাদেবকে বোঝায়।


  তুঙ্গনাথ মন্দিরটি চারুশিলা পর্বত চূড়ার ঠিক নীচে প্রায় 3680মি(12,073ফুট) উচ্চতায় অবস্থিত, যেস্থান থেকে চারুশিলা শিখরে শ্রীরাম মন্দিরের অবস্থান আরও 1000মি উচ্চ।


    * পঞ্চ কেদার সৃষ্টির পুরাণকথা।


  দেবাদিদেব মহাদেব ও গিরিরাজ হিমালয় কন্যা পার্বতীর আবাসস্থল প্রধানতঃ কৈলাস হলেও কথিত আছে যে তাঁরা হিমালয়ের বিভিন্ন গিরি চূড়ায় অবস্থান করেন।


  মহাভারত মহাকাব্যে ব্যাসদেব কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে পাণ্ডবগণ কর্তৃক জ্ঞাতি ও ব্রাহ্মণ হত্যাজনিত কৃত মহাপাপ থেকে মুক্তির উপায় স্বরূপ পঞ্চপান্ডব ভ্রাতৃগণকে কাশীধামে গিয়ে মহাদেবের তপস্যার বিধান দেন।


  তদুদ্দেশ্যে তাঁরা পরবর্তী প্রজন্মের হস্তে রাজ্যভার সমর্পণ করে কাশীধামে উপস্থিত হয়ে বুঝতে পারেন, যে মহাদেব সেখানে নাই, কারণ যুদ্ধে তাঁদের কৃত অন্যায়কে প্রভূ ক্ষমা করতে পারেন না তাই, পূর্বাহ্নেই তিনি কাশী ত্যাগ করে বর্তমান উত্তরাখণ্ডের কেদারনাথে বৃষরূপী নন্দীর ছদ্মবেশে অবস্থান করতে থাকেন ও তাঁর এই গোপন অবস্থানের জন্য স্থানটির নাম হয গুপ্তকাশী।


  পাণ্ডবগণ জানতে পারেন যে মহাদেব কেদারনাথে আছেন এবং তাঁরাও কেদারনাথে উপস্থিত হয়ে মহাদেবের সন্ধান করতে গিয়ে পর্বত চূড়া থেকে মধ্যমপাণ্ডব ভীম তৃণ ভক্ষণ রত নন্দীরূপী শিবকে চিনতে পারেন ও দুই পর্বত চূড়ায় দুই পা ফাঁক করে, সেই বৃষের লেজসহ পিছনের পদদ্বয় সজোরে চেপে ধরেন।


  মহাদেব তখন পাঁচটি ভাগে বিভক্ত হয়ে হিমালয়ের পাঁচটি পর্বত চূড়ায় পুনরাবির্ভূত হন ও পাণ্ডবগণ সেই পাঁচটি স্থানে মন্দির তৈরী করে প্রভূর তপস্যা করেন, পরবর্তীকালে আদি শঙ্করাচার্যের নির্দেশে, সেইগুলি পঞ্চকেদার নামে হিন্দুদের তীর্থস্থানে পরিণত হয়।


    * প্রভূ তুঙ্গনাথের নিত্য পূজা ও  প্রকরণ।


  অষ্টম শতাব্দীর ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা সন্ত আদি শঙ্করাচার্য নির্দেশিত প্রচলিত রীতি অনুযায়ী কেদার তীর্থে অবস্থিত পঞ্চ কেদার মন্দিরের দেবতা, তথা মহাদেব প্রধানতঃ দক্ষিণ ভারতীয় পুরোহিত ব্রাহ্মণগণ দ্বারা পূজিত হলেও, ব্যতিক্রম হিসাবে, তুঙ্গনাথ মহাদেবের পূজার্চনা স্থানীয় মুক্কুনাথ গ্রামে বাসকারী মৈথানী ব্রাহ্মণগণই করে থাকেন।


  তুঙ্গনাথ মন্দিরটি সর্বাধিক উচ্চতায় অবস্থিতির কারণে শীতকালে প্রায় ছয়মাস তুষারপাত জনিত কারণের জন্য মূল মন্দির বন্ধ থাকে, সেসময়, তুঙ্গনাথের প্রতিরূপ বিগ্রহকে মুক্কুনাথ গ্রামে মার্কণ্ডেশ্বর মন্দিরে নামিয়ে আনা হয় ও সেখানেই যথাবিহিত পূজার্চনা করা হয়, যার দূরত্ব মূল মন্দির থেকে প্রায় 29কিমি ও চোপটার থেকে 10কিমি(6মা) আগে দুগ্গলবিট্টা বা দুগ্গলভিটার সন্নিকটে।


   * আবহাওয়া সম্পর্কে জ্ঞাতব্য বিষয়।


  কেদার তীর্থক্ষেত্রগুলির মধ্যে সর্বোচ্চ শিখরে অবস্থান জনিত কারণে তুঙ্গনাথ মন্দির এলাকায় সারা বছরই শীতল আবহাওয়া বিদ্যমান থাকে ও বর্ষাকালে বৃষ্টি পাতের পরিমানও বেশী।

  

  শীতকালে এই শিখর এলাকায় কনকনে শীত থাকে ও কোন কোন সময় তা বরফাবৃত থাকে সেজন্য তুঙ্গনাথ কেদার তীর্থ ভ্রমণের উপযুক্ত সময় হল এপ্রিল থেকে অক্টোবর।


  গ্রীষ্মকালে এই এলাকার আবহাওয়া দিনের বেলায় প্রধানতঃ 16ডিগ্রী সেলসিয়াসের আশেপাশে থাকে, যা ট্রেকিং-এর ক্ষেত্রে বেশ উপযুক্ত।


   * তুঙ্গনাথ তীর্থযাত্রা সম্পর্কিত কিছু তথ্য।


   তুঙ্গনাথ পর্বত চূড়াটি, কেদারনাথে সৃষ্ট মন্দাকিনী নদীর জলকে ও তুঙ্গনাথ পর্বত শিখরে সৃষ্ট তিনটি ঝর্ণাধারা থেকে উৎপন্ন অলকানন্দা নদীর জলকে আলাদা করেছে।


    তুঙ্গনাথ মন্দিরটি অপর চারটি কেদার ক্ষেত্রের তুলনায় সর্বোচ্চ স্থানে অবস্থিত হলেও হাঁটাপথ মাত্র 5কিমি(3.1মা), তবে পথ অত্যন্ত খাড়া চড়াই, যে পথ, ট্রেকিং করে 4-5ঘণ্টায় যাওয়া যায়(শারীরিক সক্ষমতার উপর নির্ভরশীল) অথবা চোপটা থেকে যাতায়াতের জন্য ঘোড়া, ভাড়ার ভিত্তিতে পাওয়া যায়(মাঝপথে মেলে না) এবং এখানে পিটঠু, মাচান এসব পাওয়া যায় না।


  উখীমঠ - গোপেশ্বর রাস্তায় চোপটা বেস ক্যাম্প(base camp) থেকে তুঙ্গনাথ অবধি সারা রাস্তা পাথরের স্ল্যাব বসানো, যাতে পা পিছলে না যায়, (9600ফু/2926মি-11350ফুট/3559মি) এবং মাঝে মাঝে বিশ্রামের জন্য রাস্তার ধারে বেঞ্চ করা আছে, তাছাড়া বিভিন্ন দূরত্বে খাদ্য ও গরম পানীয়ের জন্য ধাবা রয়েছে।

  

   চোপটা, যাকে সৌন্দর্যের জন্য মিনি সুইজারল্যাণ্ড বলা হয়, সেখান থেকে তুঙ্গনাথ অবধি সমগ্র যাত্রাপথটির ডানদিকে গাড়োয়াল রেঞ্জের পর্বতশিখর ও উপত্যকায় বিস্তৃত তৃণভূমি যেখানে মার্চ-এপ্রিল মাসে ফুটে থাকা রডোডেন্ড্রনের(বছরের অন্য সময় দেখা যাবে না) অপরূপ শোভা ও বিস্তৃত অরন্যানী মাথায় করে প্রাচীরের মত দাঁড়িয়ে আছে,এছাড়া বামদিকে 180ডিগ্রী জুড়ে সার দিয়ে বরফাবৃত কেদার শৃঙ্গ, চৌখাম্বা(সর্বক্ষণের সঙ্গী), পঞ্চ চূলী, বান্দর পুঞ্ছ, নীলকণ্ঠ, শিবলিঙ্গ, ত্রিশূল, নন্দাঘুণ্টি, নন্দাকোট প্রভৃতি বরফাবৃত পর্বতের নয়নমনোহর অপরূপ দৃশ্য দেখতে দেখতে ট্রেকিং করে বা ঘোড়ায় চড়ে পথটুকু ফুরিয়ে যাবে।


  অরণ্যভূমি মধ্যে রয়েছে, দেওদার, ফার, পাইন, ওক ও আরো হরেক বৃক্ষরাজি, তার সাথে রয়েছে বিভিন্ন ধরণের চিতা বাঘ, হায়না, হরিণ, শেয়াল প্রভৃতি বন্যপ্রানী ও কলকাকলি মুখর অজস্র পক্ষীকূল, যার মধ্যে উত্তরাখণ্ড রাজ্যের স্বীকৃত রাজ্যপক্ষী হিমালয়ান মোনাল পক্ষীও রয়েছে।


   মহাভারতের দ্বাপর যুগের কেদার ক্ষেত্র তুঙ্গনাথ যাত্রাপথে দেখা যাবে ত্রেতা যুগের রাবণ শিলা, কথিত আছে, ঐ পর্বত চূড়ায় বসে লঙ্কাপতি রাবণ নাকি মহাদেবের তপস্যা করেছিলেন।

  

  প্রচলিত প্রবাদ আছে যে, তারারা নাকি এখানে বসে মহাদেবের তপস্যা করে, যাতে সূর্য ও চন্দ্রের উপরে তাদের স্থান হয়।

  

                       * চন্দ্রশিলা মন্দির।


  তুঙ্গনাথ মন্দির থেকে 2কিমি/1.2মা, আরও প্রায় 1000ফুট উচ্চে অবস্থিত  চন্দ্রশিলা চূড়ায় অবস্থিত মন্দির সম্পর্কে কয়েকটি প্রচলিত প্রবাদ হল, শ্রীরামচন্দ্র রাক্ষসরাজ রাবণকে বধ করার পর এখানে বসে মহাদেবের তপস্যা করেন ও অপর একটি প্রবাদ হল, চন্দ্রদেব এখানে বসেই নাকি শিবের তপস্যা করে থাকেন।


  চন্দ্রশিলা, তুঙ্গনাথ মন্দির থেকে ট্রেক রুটটির(trek route) যাত্রাপথ যেমন অত্যন্ত নয়ন মুগ্ধকর ও তেমনই বেশ খাড়াই পথ, যা ট্রেকিং খুবই কষ্টসাধ্যও।


  এক্ষেত্রে একটি কথা বলা যায় যে, শীতকালটা এড়িয়ে, তুঙ্গনাথে এক রাত্রি কাটিয়ে খুব ভোরে বেরিয়ে পড়লে, (বেলায় কুয়াশা থাকতে পারে ও তুষারাবৃত পর্বত শিখরের মনোরম দৃশ্য অদৃশ্য থাকতে পারে) চন্দ্রশিলা শিখর পথের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়।


  তুঙ্গনাথ ও চন্দ্রশিলা ভক্তজন ও ট্যুরিষ্টগণের কিছু জ্ঞাতব্য তথ্য হল, ট্রেকিং এর সময় পর্যাপ্ত গরম পোষাক, খাড়া চড়াই পার্বত্য পথে হাঁটার উপযুক্ত জুতা, সান গ্লাস, চোপতা থেকে ভাড়ার লাঠি,খাবার জল, কিছু শুকনো খাবার ইত্যাদি সঙ্গে থাকা উচিত।


                  * কিভাবে যাবেন।


  # বিমান পথ :-

    চোপটার নিকটবর্তী বিমান বন্দর উত্তরাখণ্ডের দেরাদুন জেলার জলি গ্রান্ট বিমান বন্দর(Jolly Grant Airport)। দূরত্ব 225কিমি, যেখান থেকে বাস বা ট্যাক্সিতে করে সহজেই ঋষিকেশ, রুদ্রপ্রয়াগ, উখীমঠ, চোপটা পৌঁছানো যায়।

   অপর একটি সম্ভাব্য রুট(route) হল, ভায়া হরিদ্বার থেকে ঋষিকেশ, রুদ্রপ্রয়াগ, তারপর উখীমঠ হয়ে চোপটা আসা যায়।

    

  # রেল পথ :-

    চোপটার নিকটবর্তী রেলস্টেশন হল 209কিমি দূরে অবস্থিত ঋষিকেশ যা ভারতের সকল রেল পথের সঙ্গে সুসংযুক্ত।


  # সড়ক পথ :-

    চোপটা NH58 দ্বারা ভারতের অন্যান্য শহরের সাথে যুক্ত রয়েছে।


  ** চোপটার থেকে দূরত্ব :-

  উখীমঠ -29কিমি, ঋষিকেশ - 209কিমি, হরিদ্বার - 225কিমি, শ্রীনগর-96কিমি, দিল্লী - 451কিমি, কেদারনাথ - 64কিমি, বদ্রীনাথ - 136কিমি, চোপটা - চন্দ্রশিলা - 6কিমি(ট্রেকিং করে)।


  সুধী পাঠকবৃন্দ! আশা করি পর্বগুলি আপনাদের ভাল লাগছে। পরবর্তী রুদ্রনাথ কেদার ক্ষেত্র, পর্ব  - 4 লেখাটির জন্য আমাদের ব্লগের প্রতি দৃষ্টি রাখুন। শেয়ার ও কমেন্ট করুন। ধন্যবাদ।