Mahakaleshwar Jyotirlinga Shiva Temple.
Ujjain, Madhya Pradesh, India.
মহাকালেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ শিব মন্দির।
উজ্জয়িনী, মধ্য প্রদেশ, ভারত।
তৃতীয় জ্যোতির্লিঙ্গ শিব, মহাকালেশ্বর।
ভারতবর্ষের হিন্দু ধর্মীয় মানচিত্রে ও ভক্ত-সাধকগণের অন্তরে দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ মহাদেবের এক বিশেষ স্থান রয়েছে, তা অনস্বীকার্য।
পুরাণ বর্ণিত কাহিনী অনুসারে, ঊজ্জয়িনী নগরীর প্রাচীন নাম ছিল অবন্তিকা এবং নগরীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আকর্ষনীয় ও ধর্মীয় বিকাশের প্রধান কেন্দ্রস্থল হিসাবে খুবই উচ্চ মানের ছিল।
প্রভূ মহাকালেশ্বরের প্রতি ভক্তি ও বিশ্বাস আজ এই আধুনিকতার স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনযাত্রা সত্ত্বেও, নগরবাসী জনসাধারণের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গরূপে সেই প্রাচীনকাল থেকে ধর্মীয় ঐতিহ্য বহন করে চলেছে।
* প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ
দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ শিব মন্দিরগুলির মধ্যে মহাকালেশ্বর মন্দিরটির সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে গড় উচ্চতা হল 494m/1621ft. যার ভিত্তিতে মন্দিরটির অবস্থান সপ্তম স্থানে রয়েছে।
প্রচলিত প্রবাদ অনুসারে মহাকালেশ্বর মন্দিরের জ্যোতির্লিঙ্গ মহাদেবের লিঙ্গরূপটি, স্বয়ম্ভূ, তথা এখানে তিনি নিজ দৈবিক ক্ষমতাবলে স্বয়ং আবির্ভূত হয়েছেন।
অন্যান্য জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দিরে, যেখানে মন্ত্রশক্তির দ্বারা শিবলিঙ্গ মূর্তি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া অনুসারে স্থাপিত ও জাগ্রত করা হয়ে থাকে।
ভস্ম আরতি :- মহাকালেশ্বর মন্দিরের প্রধান আকর্ষণ, মহাদেবের ভস্ম আরতি, যা প্রত্যহ প্রত্যুষে ভক্তদের সম্মুখে মন্দিরের নিত্য পূজার প্রথমভাগে অনুষ্ঠিত হয়।
মহাকালেশ্বর মন্দিরে প্রত্যহ অতি প্রত্যূষে শ্মশানঘাট থেকে নিয়ে আসা চিতাভস্ম সহযোগে, প্রভূর ঊষাকালীন পূজার্চনা ও ভস্ম আরতি ভক্তবৃন্দের উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্যে দিয়ে পালন করা হয়ে থাকে।
জৈন শহর উজ্জয়িনীর মহাকালেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ মহাদেবের দক্ষিনমুখী অবস্থান, যা 'শিব নেত্র পুরাণে' উল্লিখিত হয়েছে ও সেই প্রথা মেনে নির্মিত হয়েছে, তা অন্য কোন জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দিরে দেখা যায় না।
স্থানীয় অধিবাসীগণের বিশ্বাস যে,মহাকালেশ্বর মহাদেব মানব জীবনে শরীর ও মনের প্রভূ ও নিয়ন্ত্রক এবং বয়স বৃদ্ধি ও সেই সংক্রান্ত সকল সমস্যার সমাধান তিনিই করেন।
প্রাচীনকাল থেকে রাজাগণ ও উজ্জয়িনীবাসীগণ মহাকালেশ্বশরের পূজার্চনা ও তাঁর সুরক্ষা বিষয়ে বিশেষভাবে তৎপর রয়েছে।
* মহাদেবের জ্যোতির্লিঙ্গ রূপ ধারণের পৌরাণিক কাহিনী।
প্রাচীন 'শিব পুরাণ' অনুসারে, ব্রহ্মা ও বিষ্ণুর মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে বিবাদ হলে, তাঁরা মহাদেবের নিকট সমাধান প্রার্থনা করেন।
মহাদেব তাঁদের সমস্যার সমাধান করতে স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতাল জুড়ে এক অনাদি অনন্ত গর্ত সৃষ্টি করে, স্বয়ং এক জ্যোতির্লিঙ্গ রূপে সেই গর্ত মধ্যে অবস্থান করেন ও ব্রহ্মা ও বিষ্ণুকে সেই জ্যোতিঃ-স্তম্ভের ঊর্দ্ধ-অধঃদেশ সন্ধান করতে বলেন।
ব্রহ্মা ও বিষ্ণু ফিরে এসে বিষ্ণু সত্য বলেন, কিন্তু ব্রহ্মা শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে ঊর্দ্ধদেশ দেখেছেন বলে মিথ্যা বলেন এবং মহাদেব বিষ্ণূর পঞ্চম আনন ছেদ করে শাস্তি দেন।
মহাদেবের এই জ্যোতিঃ স্তম্ভরূপ ধারণ তাঁর এক অনাদি-অনন্ত রূপের বহিঃপ্রকাশ, যা মনুষ্য কেন দেবতাদেরও অজ্ঞাত ও তিনি ভারতবর্ষের দ্বাদশ স্থানে এই রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন।
জ্যোতির্লিঙ্গ রূপে তিনি দ্বাদশ মন্দিরে, দ্বাদশ নামে অবস্থান করেন এবং উজ্জ্বয়িনীতে তিনি মহাকালেশ্বর মহাদেব রূপে প্রাচীন কাল থেকে পূজিত হন।
* মহাকালেশ্বর মন্দির ও তার গঠনশৈলী।
মহাকালেশ্বর মন্দিরটি উজ্জয়িনী নগরে, একটি বিশাল চত্বর জুড়ে সুউচ্চ প্রাচীরবেষ্টিত প্রাঙ্গনে, রুদ্রসাগর হ্রদের তীরে অবস্থিত।
স্থাপত্য শিল্পের অতি সূক্ষ্ম কারুকার্যমণ্ডিত সুউচ্চ মন্দির শীর্ষের গঠনশৈলী, বিশেষভাবে দর্শনীয় ও উপভোগ্য হিসাবে বিরাজমান।
প্রভূ ওঙ্কারেশ্বরের মূর্তি এই মন্দিরের সর্বোচ্চ তলে এক সুসজ্জিত গর্ভগৃহে প্রতিষ্ঠিত ও পূজিত হন এবং গর্ভগৃহের অভ্যন্তরে তিনদিকের মধ্যে, পশ্চিমদিকে প্রভূ গণেশ, উত্তরে দেবী পার্বতী ও পূর্বে ময়ূরবাহন দেব কার্তিকেয়র বিগ্রহ প্রত্যহ পূজিত হন।
মন্দিরের দক্ষিণদিকে মহাদেবের বাহন নন্দীকেশ্বর ষণ্ডের অবস্থান স্থল।
প্রভূ নাগচন্দ্রেশ্বরের মূর্তি মন্দিরের তৃতীয়তলে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে, যা বৎসরে একদিন, শুধুমাত্র 'নাগপঞ্চমী' তিথিতে জনগণের দর্শনের জন্য খোলা হয়।
মন্দিরটি পঞ্চমতল বিশিষ্ট্য, যার ভিতর একটি গর্ভগৃহ ভূগর্ভ স্তরে অবস্থিত, যেখান প্রধান দেবতা মহাকালেশ্বরের অবস্থান ও সেখানে প্রবেশ পথটি পিতলের সুদৃশ্য প্রদীপের আলোকসমূহ দ্বারা সুসজ্জিত করা হয়েছে।
প্রধান দেবতা মহাকাল শিব সুপ্রাচীনকাল থেকে এই জৈন নগরী উজ্জ্বয়িনী ও তার অধিবাসীগণের হৃদয়ে এবং আধ্যাত্মিক জীবন জুড়ে অবিচ্ছিন্নভাবে অবস্থান করছেন।
* মহাকালেশ্বরের পাল্কীযাত্রা :-
"শাহী সওয়ারী"
প্রভূ মহাকালেশ্বরের পাল্কী যাত্রা স্থানীয়ভাবে "শাহী সওয়ারী" হিসাবে শ্রাবণ মাসের প্রতি সোমবার সুসজ্জিত শোভাযাত্রা সহকারে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।
বাবা মহাকালেশ্বর নবপোষাক ও অলঙ্কারে সজ্জিত হয়ে, নবরূপে প্রতি বৎসর, রৌপ্য নির্মিত পাল্কীতে, সাড়ম্বরে নবরূপে নগর পরিক্রমা করেন ও নগরবাসী ও ভক্তগণকে দর্শন দেন।
শ্রাবণ মাসের শেষ সোমবার বাবা মহাকালেশ্বরের এই পাল্কী যাত্রাকে বলা হয়, " রাজকীয় সওয়ারী" যাত্রা।
প্রভূর পাল্কীযাত্রা মন্দির থেকে বার হয়ে বিশাল শোভাযাত্রা সহ নগর পরিক্রমা শেষে প্রাচীন ক্ষিপ্রা তথা শিপ্রা নদীতটে উপস্থিত হয়ে, সেখানে রীতিমাফিক পূজার্চনার পর পুনরায় মন্দিরে প্রত্যাবর্তন করে।
* ধ্বংস ও পুনর্গঠন
সুলতান শামসুদ্দীন ইলতুৎমিস 1234-1235 সালে উজ্জ্বয়িনী লুন্ঠনকালে মহাকালেশ্বর মন্দির লুন্ঠন ও ধ্বংস করেন।
হিন্দু পাদ-পাদশাহীর ছত্রপতি শিবাজী মহারাজ ও পেশোয়া বাজীরাও শিন্ধে মহারাজ(শিন্ধিয়া), মহাকালেশ্বর মন্দির সংস্কার ও পুনর্নির্মান করে বর্তমান মন্দিরটি তৈরী করেন।
* পরিচালন ব্যবস্থা
পরবর্তী সময়ে মহাদাজী সিন্ধে মহারাজ (প্রথম মাধবরাও সিন্ধে 1730-1790) এবং মহারানী বায়জাবাঈ রাজে সিন্ধে (1827-1863), এই মন্দিরের সংস্কার ও পরিচালন ব্যবস্থার দায়িত্ব গ্রহন করেন।
ভারতের স্বাধীনতা পরবর্তীকালে দেবস্থান ট্রাস্টের স্থানে উজ্জ্বয়িনী পৌরসংস্থা মন্দির পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে ও বর্তমানে এটি একটি কালেক্টরেটের অধীনে রয়েছে।
* মহাশক্তিপীঠ উজ্জ্বয়িনী।
পুরাণ অনুসারে কথিত আছে যে, দেবী সতীর ঊর্দ্ধ ওষ্ঠাধর এখানে পতিত হয়েছিল ও এই শক্তিপীঠে মাতা মহাকালীরূপে ও তাঁর অভিভাবক কালভৈরব মহাকালেশ্বর রূপে এখানে বিরাজ করেন।
* প্রধান দেবতা :- মহাকালেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ শিব,
* সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা :- 494m/1621ft,
* প্রবেশ মূল্য :- নাই। VIPগণের জন্য INR 250,
* ভস্ম আরতি দর্শন :- 4.00am-6.00am, আরতি দর্শনের জন্য দুপুর 12.30pm মধ্যে online এ দরখাস্ত করতে হয় ও সন্ধ্যা 7.00pm এ তালিকা প্রকাশিত হয়। আরতি দর্শনের জন্য প্রমাণ স্বরূপ Photo ID সঙ্গে থাকতে হবে, PAN Card গ্রাহ্য হবে না।
** সাধারণ দর্শনের জন্য কোন পোষাক বিধি নাই।
জলাভিষেক দর্শনের জন্য পুরুষদের ক্ষেত্রে ধুতি ও শাল (যা বাইরে দোকানে কিনতে পাওয়া যাবে অথবা মন্দিরে ভাড়ায় পাওয়া যাবে।
মহিলাদের জন্য শাড়ী।
* স্থাপত্যরীতি :- ভৃমিজ, চালুক্য ও মারাঠা রীতি।
* প্রধান উৎসব :- মহাশিবরাত্রির দিন এখানে এক বিশাল মেলায় ভক্তগণ মহা উৎসাহে অংশগ্রহণ করেন। ঐদিন সারারাত্রি মহাদেবের পূজার্চনা চলে।
* ফোটোগ্রাফী :- অনুমতি নাই। ভক্তগণ ষ্টিল বা ভিডিও ক্যামেরা, ব্যাগ, মোবাইল ফোনসহ ভিতরে প্রবেশ করতে পারেন না। লকার ও ক্লোক রুমের সুব্যবস্থা রয়েছে।
* কিভাবে যাবেন :-
বিমানপথ:- মহারানী অহিল্যাবাঈ হোলকার আন্তর্দেশীয় বিমান বন্দর (53km)।
রেলপথ:- উজ্জয়িনী জংশন রেলওয়ে স্টেশন, যা ভারতবর্ষের সমস্ত এলাকার সাথে যুক্ত রয়েছে।
সড়কপথ:- মন্দিরটি সড়কপথে সারা ভারতের সাথে সংযুক্ত আছে।
* দর্শনীয় স্থানসমূহ :-
1) কালভৈরব মন্দির, 2) রাম মন্দির ঘাট, 3) কুম্ভ মেলা, উজ্জ্বয়িনী, 4) হরসিদ্ধি শক্তিপীঠ, 5) ISCON Temple, উজ্জ্বয়িনী, 6) কালিয়াদহ প্রাসাদ, 7) যন্তর-মন্তর, 8) ভর্তিহরি গুহা সমূহ, ইত্যাদি।
সুধী পাঠকবৃন্দ, আমাদের ব্লগের লেখাটি ভালো লাগলে আপনাদের মন্তব্য ও শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।