Setubandha Rameshwaram Jyotirlinga temple
Tamilnadu, India.
সেতুবন্ধ রামেশ্বরম্ জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দির
তামিলনাডু, ভারত।
ভারতবর্ষ তথা সারা বিশ্বে হিন্দু ধর্মমতে পুরাণকথিত কাহিনী অনুসারে দেবাদিদেব মহাদেব, জ্যোতির্লিঙ্গরূপ ধারণ করেছিলেন।
সেই জ্যোতির্লিঙ্গ ভারতবর্ষের দ্বাদশ স্থানে প্রকটিত হয়েছিল।
সেই বারোটি স্থানে মহাদেবের জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
হিন্দুধর্মে বিশ্বাসী শাক্ত, বৈষ্ণব, শৈব, সকল ভক্তবৃন্দের কাছে এই বারোটি স্থান পূণ্য তীর্থভূমি হিসাবে পরিগণিত হয়ে থাকে।
আমাদের আজকের আলোচ্য পূণ্য তীর্থের নাম, সেতুবন্ধ রামেশ্বরম্ জ্যোতির্লিঙ্গম্ মন্দির।
তামিলনাড়ুর এই রামেশ্বরম্ ভারতবর্ষে অবস্থিত চার ধামের মধ্যে অন্যতম।
চারটি ধাম হল, উত্তরে বদ্রীনাথধাম,
দক্ষিনে রামেশ্বরম্ ধাম, পশ্চিমে দ্বারকাধাম ও পূর্বে জগন্নাথধাম।
পুরাণমতে মহাদেবের জ্যোতির্লিঙ্গ রূপ ধারণ কাহিনী
কথিত আছে, সত্যযুগে একদা ব্রহ্মা ও বিষ্ণুদেবের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে বিবাদ উপস্থিত হয়।
তাঁরা দুজনেই নিজ নিজ শ্রেষ্ঠত্ব দাবী করতে থাকেন।
সিদ্ধান্তের জন্য তাঁরা দেবাদিদেব মহাদেবের শরণাপন্ন হন।
তিনি স্বর্গ, মর্ত্য, পাতাল জুড়ে এক বিশাল গর্ত সৃষ্টি করেন।
আদি-অন্তহীন ত্রিগুণাতীত মহাদেব এক জ্যোতির্লিঙ্গরূপ ধারণ করে সেই গর্তের মধ্যে বিরাজমান হন।
ব্রহ্মা ও বিষ্ণুকে সেই জ্যোতির্লিঙ্গের আদি ও অন্ত খুঁজে আসতে বলেন।
বিষ্ণু বরাহরূপ ধারণ করে পাতালে সন্ধান করতে যান ও ফিরে এসে সত্য স্বীকার করে বলেন যে, সেই লিঙ্গের আদি খুঁজে পান নি।
অপরদিকে, বিষ্ণু ঊর্ধ্বদেশ সন্ধানে পক্ষীরূপে গমণ করেন।
ফিরে এসে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে মিথ্যা কথা বলেন, যে তিনি তা দেখেছেন।
প্রমাণ স্বরূপ একটি কেতকী পুষ্প দেখান।
মহাদেব বুঝে যান, কে সত্য ও কে মিথ্যা কথা বলছেন।
তিনি কুপিত হয়ে ব্রহ্মার পঞ্চম আনন ছেদন করেন ও অভিশাপ দেন যে কোন মন্দিরে ব্রহ্মার পূজা হবেনা।
সেই থেকে ব্রহ্মা 'চতুরানন' নামে আখ্যায়িত হন।
এছাড়া, মিথ্যা সাক্ষ্য দেবার অপরাধে কেতকী পুষ্পকে অভিশাপ দেন যে, কোন দেবতার পূজায় কেতকী ফুল ব্যবহৃত হবেনা।
আজও কোন মন্দিরে ব্রহ্মার পূজা হয় না ও কেতকী ফুল দেবতার পূজায় লাগে না।
রামেশ্বরম্ জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দির
রামেশ্বর বা রামনাথস্বামী অর্থে রামের যিনি ঈশ্বর বা নাথ অর্থাৎ দেবাদিদেব মহাদেব।
তিনিই আদি দেবতা ও অন্য সকল দেবতাদেরও আরাধ্য।
প্রভূ রামচন্দ্র, লক্ষ্মণ ও সীতাদেবী বনবাসে থাকাকালীন লঙ্কেশ্বর রাক্ষসরাজ রাবণ সীতাদেবীকে অপহরণ করেন।
তাঁকে উদ্ধারের জন্য রামচন্দ্র বানর সৈন্যদল নিয়ে রামেশ্বরে উপস্থিত হন।
দেব স্থপতি বিশ্বকর্মার সুযোগ্য পুত্র নল রামেশ্বরম্ থেকে লঙ্কা অবধি সমুদ্রের উপর একটি সেতু নির্মান করে দেন।
রামেশ্বরমে প্রভূ রামচন্দ্র বালির একটি শিবলিঙ্গ গড়ে লঙ্কা বিজয়ের জন্য পূজা করেন।
সীতাদেবীকে উদ্ধার করে রামেশ্বরমে এসে রামচন্দ্র পুনরায় শিব পূজার জন্য শিবলিঙ্গ আনয়ন করতে হনুমানজীকে কাশীতে প্রেরণ করেন।
ব্রহ্মহত্যার পাপ থেকে মুক্ত হতে তিনি প্রভূ বিশ্বেররের শরণাপন্ন হন।
কারণ, রাবণ ছিলেন ব্রাহ্মণ এবং পুলস্ত্য ৠষির পৌত্র ও বিশ্বশ্রবা ও রাজকন্যা কৈকেশীর পুত্র।
কিন্তু, তাঁর ফিরতে দেরী হওয়ায় শ্রীরামচন্দ্র(মতান্তরে সীতাদেবী) বালি দিয়ে একটি শিবলিঙ্গ গড়ে পূজা করেন।
এরপরই হনুমানজী কৈলাশ থেকে শিবলিঙ্গ নিয়ে হাজির হন।
পূর্বেই পূজা সম্পন্ন হয়েছে দেখে তিনি ক্ষুন্ন হন ও সক্রোধে তাঁর আনীত সেই লিঙ্গটিকে ল্যাজে জড়িয়ে উৎপাটন করে, সমুদ্রে নিক্ষেপ করার চেষ্টা করেন।
কিন্তু তাঁর শত চেষ্টাতেও তা ব্যর্থ হয়। এরপর, রামচন্দ্র হনুমানজীর আনীত শিবলিঙ্গটিকেও পূজা করেন।
আজও সেই শিবলিঙ্গের গাত্রে হনুমানজীর ল্যাজে জড়ানোর দাগ দেখতে পাওয়া যায়।
শ্রীরামচন্দ্র আদেশ দেন যে, সর্বদা হনুমানজীর আনা শিবলিঙ্গের পূজা প্রথমে হবে ও পরে তাঁর নির্মিত লিঙ্গের পূজা করা হবে।
আজও সেই নিয়ম চলে আসছে। গর্ভমন্দিরে দুটি লিঙ্গই বিরাজমান রয়েছে।
মন্দিরের গর্ভগৃহে শ্রীরামের নির্মিত লিঙ্গরূপে বিরাজমান মহাদেব শ্রীরামনাথস্বামী ও হনুমানজীর কাশী থেকে আনা লিঙ্গটি বিশ্বলিঙ্গম্ বা বিশ্বনাথ নামে অভিহিত হয়।
রামেশ্বরম্ মন্দির প্রভূ মহাদেব ও শ্রীরামচন্দ্র উভয়ের উদ্দেশ্যেই উৎসর্গীকৃত এবং একটি অন্যতম হিন্দু তীর্থক্ষেত্র।
রামেশ্বরমেরম্ হল চার ধামের মধ্যে একমাত্র ধাম যেখানে প্রধান দেবতা মহাদেব বাস করেন ও অন্যেরা হলেন প্রভূ বিষ্ণু এবং তাঁর সপ্তম অবতার শ্রীরামচন্দ্রও পূজিত হন।
এই তীর্থক্ষেত্রের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, এটি প্রথমত একটি মহাদেবের জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দির ও দ্বিতীয়ত শ্রীরাম ও প্রভূ বিষ্ণুরও আবাসস্থল হিসাবে শৈব ও বৈষ্ণব উভয়েরই তীর্থক্ষেত্র।
পুরাণে কথিত আছে যে, কাশীধাম তীর্থ দর্শনের পর রামেশ্বরম্ ধাম দর্শন ও পূজন না করলে তীর্থযাত্রার সম্পূর্ণ পূণ্যফল লাভ হয় না।
রামেশ্বরম্ তীর্থ "দক্ষিণের কাশী" নামে অভিহিত হয়।
মন্দিরের গঠন শৈলী
রামনাথস্বামী মন্দিরটিও দক্ষিণ ভারতের অন্যান্য মন্দিরের ন্যায়, দ্রাবিড়ীয় স্থাপত্যশিল্পের সুষমা মন্ডিত ভারতীয় পেনিনসুলার শেষ বিন্দুতে অবস্থিত এক পূণ্য তীর্থ ক্ষেত্র। মন্দির এলাকার চতুষ্পার্শ্ব সুবৃহৎ(54meteres) গোপুরম্(gate-tower)সহ সুউচ্চ প্রাচীর দিয়ে ঘেরা।
ভারতবর্ষের মধ্যে সুউচ্চ স্তম্ভ সমূহ সজ্জিত এশিয়ার সর্ববৃহৎ বারান্দা (197মিটার) বিশিষ্ট, পূর্ব থেকে পশ্চিমে বিস্তৃত ও পৃথিবীর মধ্যে তৃতীয় বৃহত্তম বারান্দা (133মিটার)যেটি দক্ষিণ গোপুরম্ থেকে উত্তরে সেতুমণ্ডপম্ মন্দির অবধি বিস্তৃত রয়েছে।
রামেশ্বরম্ মান্নার উপসাগরে অবস্থিত একটি দ্বীপ এবং সেখানে অবস্থিত মন্দির চত্বরের আশেপাশে 64টি তীর্থ অর্থাৎ পবিত্র জলাধার রয়েছে।
স্কন্দ পুরাণ অনুসারে, তার মধ্যে 24টি জলাশয় খুবই পবিত্র।
রামেশ্বরম্ তীর্থযাত্রীরা ঐসকল পবিত্র তীর্থ অর্থাৎ জলাশয়ে স্নান করলে তাদের তীর্থ ভ্রমণের আশানুরূপ ফললাভ হয়ে থাকে।
রামনাথস্বামী মন্দির সংলগ্ন অবশিষ্ট 22টি জলাশয় শ্রীরামচন্দ্রের তূনীরের মধ্যস্থ 22টি তীর হিসাবে পরিগণিত হয়।
সেগুলির মধ্যে প্রধানটিকে বলা হয় 'অগ্নি তীর্থম্'।
কথিত আছে, 1897 সালে স্বামী বিবেকানন্দ এই মন্দিরে রামনাথস্বামীর পূজা করেছিলেন।
কিভাবে যাবেন :-
বিমান পথ :- রামেশ্বরম্ মন্দিরের নিকটবর্তী মাদুরাই বিমান বন্দর থেকে দূরত্ব প্রায় 175কিমি। এছাড়া থুথুকুডি বিমান বন্দর থেকে দূরত্ব প্রায় 195কিমি।
রেল পথ :-
তীর্থক্ষেত্রটি চেন্নাই ও মাদুরাই এর সাথে রেলপথে সংযুক্ত এবং রামেশ্বরম্ রেল স্টেশন থেকে মন্দিরের দূরত্ব মাত্র 1.3কিমি।
সড়ক পথ :-
রামেশ্বরম্ মন্দির অবধি সড়ক পথে যোগাযোগ খুবই উন্নত মানের।
রামেশ্বরম্ বাস স্ট্যাণ্ড থেকে মন্দির মাত্র 2কিমি।
দর্শনীয় স্থান সমূহ :-
1) অগ্নিতীর্থ, 2) গন্ধমাদন পর্বত, 3) রামঝরোকা মন্দির, 4) ধনুষ্কোডি :- দ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তে রামেশ্বরম্ থেকে 8 কিমি দূরত্বে অবস্থিত। এটি শ্রীরামের ধনুক নামে অভিহিত হয়। 5) এরওয়াডি :- এটি ইব্রাহিম শাহিদ আউলিয়ার কবরস্থান ও মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের তীর্থক্ষেত্র হিসাবে পরিগণিত হয়। প্রতি বৎসর ডিসেম্বর মাসে ধর্মপ্রাণ মুসলিমগণ এই সাধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এখানে আসেন।
সুধী পাঠকবৃন্দ! আশা করি লেখাটি আপনাদের ভালো লেগেছে। এটি অন্য বন্ধু-বান্ধবের কাছে শেয়ার করার অনুরোধ রইল। ধন্যবাদ।