The Brihadishwar Shiva Temple of Tanjavur, Tamil Nadu, India.
The great living Chola temples of 11th century CE.
একাদশ শতকের চোল রাজবংশের মহান কীর্তি তাঞ্জাভুরের বৃহদীশ্বর শিব মন্দির, তাঞ্জাভুর, তামিলনাড়ু, ভারত।
ঠিকানা : তাঞ্জাভুর প্যালেস দেবস্থানম্, নং - 1221 ওয়েস্ট মেন স্ট্রীট, তাঞ্জাভুর, তামিল নাড়ু - 613009
ফ্যাক্স : +91-4362 223387
একাদশ থেকে দ্বাদশ শতকে নির্মিত তামিলনাড়ুর চোল রাজাদের মন্দির নির্মানের ক্ষেত্রে, মহান কীর্তিগুলি যেমন, 1) বৃহদীশ্বর শিব মন্দির, তাঞ্জাভুর, 2) বৃহদীশ্বর শিব মন্দির গঙ্গাইকোণ্ডচোলপুরম ও 3) ঐরাবতেশ্বর মন্দির, দারাসুরাম, যা আজও সমানভাবে ভক্তবৃন্দ ও ভ্রমণপিপাসুদের বিস্ময় উদ্রেক করে।
বৃহদীশ্বর শিব মন্দির গঙ্গাইকোণ্ডচোলীশ্বরম্, চোল বংশের রাজা রাজেন্দ্র চোল-1 কর্তৃক 1035 সালে নির্মিত হয়েছিল।
এই 53মিটার(173.884ফুট) সুউচ্চ মন্দির চূড়াটির (বিমান) নির্মান, তাঞ্জাভুর বৃহদীশ্বর মন্দিরের আদলে নির্মিত হয়েছে ও সেইরকমই ক্রমাগত ছোট হওয়া স্তরে স্তরে খাঁজকাটা কোণগুলি খাড়াভাবে উপরের দিকে উঠে গিয়েছে এবং শীর্ষদেশে একটি অর্ধবৃত্তাকার স্তুপাকৃতি প্রস্তর স্থাপিত হয়েছে, যা দ্রাবীড়ীয় স্থাপত্য শিল্পের এক উজ্জ্বল নিদর্শনস্বরূপ।
এতদ্ব্যতীত, ঐরাবতেশ্বর মন্দিরসহ উল্লিখিত মন্দিরগুলি চোল রাজাদের শিল্প, স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও ব্রোঞ্জ নির্মিত বিভিন্ন মূর্তি ও দ্রব্যগুলি, এক উন্নত শিল্পভাষ্কর্যবোধের পরিচয় বহন করে।
বিষেশভাবে উল্লেখ করা যায় যে, একাদশ থেকে দ্বাদশ শতকের তামিলনাড়ু রাজ্যের চোল রাজবংশ নির্মিত উক্ত তিনটি কালজয়ী মন্দির, তাঞ্জাভুর মন্দির এবং গঙ্গাইকোণ্ডচোলীশ্বরম্ মন্দির 1987 সালে ও ঐরাবতেশ্বর মন্দির 2004 সালে(তাঞ্জাভুরের সম্প্রসারিত অংশ হিসাবে), গুচ্ছাকারে, 'Great Living Chola Temples'- এই সাংস্কৃতিক(Cultural) পর্যায়ে 'বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান' (World Heritage Site) হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করেছে,যা ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে এক বিরল দৃষ্টান্ত।
ঋ
সহস্র বর্ষাধিক পূর্বে নির্মিত তাঞ্জাভুরের বৃহদীশ্বর শিব মন্দিরটির চোল যুগের অপরূপ স্থাপত্যশৈলী, পরবর্তীকালে সারা ভারতে বহু মন্দির ও সৌধ নির্মানে এই দ্রাবিড়ীয়রীতির প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়।
তাঞ্জাভুরের বৃহদীশ্বর শিব মন্দিরটি প্রধানতঃ শৈব ধর্মমতের অনুসারী হলেও, তা শাক্ত ও বৈষ্ণব মতকেও সমান মর্যাদা প্রদান করেছে, যেহেতু সেখানে শক্তির দেবী পার্বতী ও বৈষ্ণব ধর্মের দেবতা প্রভূ বিষ্ণুদেবের মূর্তিও প্রতিষ্ঠালাভ করেছে।
দক্ষিন ভারতের ও তামিলনাড়ুর বিভিন্ন অংশে দ্রাবীড়ীয় স্থাপত্যরীতির বহু উদাহরণ লক্ষ্য করা যায়, তার মধ্যে তাঞ্জাভুরের চোল রাজবংশের প্রবল প্রতাপান্বিত মহারাজ, রাজরাজ-1 কর্তৃক নির্মিত (1003-1010CE) বৃহদীশ্বর শিব মন্দিরটি সৌন্দর্য ও স্থাপত্যশৈলীর জন্য খুবই বিখ্যাত।
তাঞ্জাভুর বৃহদীশ্বর মন্দিরটি স্থানীয়ভাবে থাঞ্জাই পেরিয়া কোভিল(Thanjai Peria Kovil) বা রাজরাজেশ্বরম্ মন্দির নামে পরিচিত ও সেটি কাবেরী নদীর দক্ষিন তীরে অবস্থিত।
শ্রীবিমান :- তাঞ্জাভুর বৃহদীশ্বর শিব মন্দিরের গর্ভগৃহের সুউচ্চ সৌধের 'বিমান'(গর্ভগৃহের উপরের অংশ)টির সবথেকে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল অনেকগুলি পিরামিড আকৃতির বর্গাকার তলা ক্রমাগত ছোট হয়ে বিশালাকৃতি ধারণ করেছে এবং সেটিকে 'দক্ষিন মেরু'ও বলা হয়।
এইরূপ নামের কারণ হিসাবে উত্তরে অবস্থিত মহাদেবের বাসস্থান 'কৈলাশ মেরু'র দক্ষিনে তাঞ্জাভুরে অবস্থিত বৃহদীশ্বর শিব মন্দিরের সুউচ্চ চূড়াকে কৈলাশ মেরুর প্রতীক হিসাবে, 'দক্ষিন মেরু' বোঝান হয়েছে।
স্তুপিকা :- মন্দিরের বিমানের শীর্ষদেশ অর্ধ গোলাকৃতি প্রস্তর নির্মিত স্তুপ আকৃতির, যার উপর ধ্বজাদণ্ড ও মঙ্গল চিহ্নস্বরূপ একটি ধ্বজা উড্ডীয়মান থাকে এবং সেই 'স্তুপিকা'টি, যা ঐ বিমানের শোভা ও উচ্চতা বহুগুণ বৃদ্ধি করেছে, এটিকে 'কুম্ভম্' বলা হয়।
তাঞ্জাভুর মন্দিরের স্তুপিকাটি একশিলাপাথর কেটে তৈরী ও সেটির ওজন প্রায় 80টন এবং সেটিকে সুউচ্চ বিমানের উপরে সেযুগে প্রতিষ্ঠিত করার কৌশল আজ এক বিস্ময় সৃষ্টি করে।
গোপুরম্ :- দ্রাবীড়ীয় তথা দক্ষিন ভারতীয় মন্দির স্থাপত্যের তৃতীয় বৈশিষ্ট্য হল তার গোপুরম্ বা সুউচ্চ প্রবেশপথ সহ, প্রাকার দ্বারা মন্দির ও চত্বরটি বেষ্টিত থাকে।
* তাঞ্জাভুর মন্দিরের গঠনশৈলী, স্থাপত্য ও ভাষ্কর্য।
তাঞ্জাভুর বৃহদীশ্বর মন্দিরটি ভৃমিভাগে দুটি উচ্চ আয়তাকৃতি প্লাটফর্মের উপর গঠিত হয়েছে যা পূর্ব-পশ্চিমে 239.79m(790ft) এবং উত্তর-দক্ষিনে 121.92m(400ft) বিস্তৃত ও সেটি পাঁচটিভাগে বিভিন্ন দেবদেবীর মন্দির এবং প্রাকার দ্বারা শোভিত।
এই পাঁচটি ভাগে রয়েছে সুউচ্চ বিমানবিশিষ্ট প্রধান মন্দির, মাঝে মুখমণ্ডপম্ বা সভাগৃহ, তারপর নন্দী মণ্ডপম্ বা নন্দীর আবাসস্থল, এরপর মহামণ্ডপম্ অর্থাৎ বিশাল সমাবেশস্থল ও তারপর অর্ধমণ্ডপম্ যেটি মূল গর্ভগৃহ ও সমাবেশস্থলকে সংযুক্ত করেছে।
নন্দীমণ্ডপে শিবের বাহন নন্দীষণ্ডের একটি একশিলা (প্রায় 250টন) নির্মিত প্রতিকৃতি, উপবিষ্ট অবস্থায় যেন প্রভূর আদেশের অপেক্ষা করছে এবং বিশালতার দিক থেকে সেটি, 2মিটার উচ্চ, 6মিটার লম্বা ও 2.5মিটার চওড়া এবং সারা দেশের সুবৃহৎ নন্দী মূর্তিগুলির মধ্যে অন্যতম।
সুবিস্তৃত মন্দির প্রাঙ্গনটি পৌরণিক কাহিনী চিত্রিত, বিশাল বিশাল স্তম্ভসম্বলিত ও ছাদযুক্ত বারান্দা দ্বারা বেষ্টিত, যার ভিতর 450m(1480ft) পরিধির এক চক্রাকার মন্দির-প্রদক্ষিন পথ রয়েছে।
তাঞ্জাভুরের বৃহদীশ্বর শিব মন্দিরটির আকৃতি ও শিল্প সুষমা, একাদশ শতকের পূর্বে নির্মিত সমস্ত দ্রাবিড়ীয় স্থাপত্যশিল্পকে ছাপিয়ে গিয়েছে, যা চোলযুগের স্থাপত্যশিল্পীদের মৌলিক নির্মান কৌশল, শৈল্পিক চেতনা ও সুনিপুন দক্ষতার এক চরম পর্যায়ের নিদর্শন স্বরূপ।
তাঞ্জাভুর বৃহদীশ্বর শিব মন্দিরের প্রধান স্থপতি ছিলেন, কুঞ্জারা মাল্লান্ রাজ রাজ পেরুন্থাচান্ ।
মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রতিষ্ঠিত বৃহদীশ্বর শিব লিঙ্গম্ টি যা, দেবাদিদেব মহাদেবের বিমূর্ত দৈব প্রতীকস্বরূপ, যেটি 8.7m(25ft) উচ্চ এবং মন্দিরের দুটি তলা জুড়ে অবস্থান করছে।
ভারতের আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইণ্ডিয়া বর্তমানে তাঞ্জাভুর মন্দিরের নিরাপত্তা, সংরক্ষণ, পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা, সৌন্দর্যায়ন এবং আলোকসজ্জা(প্রতিটি কোণ,খাঁজ, প্রাচীন প্রস্তরের রঙ, স্থাপত্যশিল্পকর্ম ইত্যাদির সমরূপ প্রদর্শন) প্রভৃতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেছে।
*চোল স্থাপত্যের কয়েকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
1) তাঞ্জাভুর বৃহদীশ্বর মন্দিরের সুবিস্তৃত বিশাল বারান্দা,
2) ভারতবর্ষের মধ্যে দেবাদিদেব মহাদেবের বিশালতম শিবলিঙ্গ,যা একশিলা প্রস্তর দ্বারা নির্মিত,
3) মন্দিরে অষ্ট দিকপালক
(আটটি দিকের দেবতা), ইন্দ্র, অগ্নি, যম, বরুণ, বায়ু, নৈঋত, ঈশান ও 8মিটার উচ্চ ধন-সম্পদের দেবতা কুবেরের মুর্তি রয়েছে,
4) মন্দিরের ভিতরের ছাদে রঙীন তৈলচিত্রগুলিতে প্রাকৃতিক রঙ ব্যবহার করার ফলে সেগুলি আজ সহস্র বৎসর পরেও সজীব রয়েছে,
5) বৃহদীশ্বর মন্দির-চূড়াটি পৃথিবীর সর্বোচ্চ মন্দির-চূড়া,
6)পৃথিবীর হিন্দু শিব মন্দিরের মধ্যে সম্পূর্ণ গ্রানাইট পাথরে নির্মিত সর্ব প্রথম মন্দির,
7) এই মন্দিরের সুউচ্চ চূড়াটি যেটিকে 'বিমান' বলা হয়, সেটি এমনভাবে নির্মান করা হয়েছে যে বিকালে মাটিতে তার কোন ছায়া পড়েনা,
8) মন্দিরে 81টি নৃত্যের ভঙ্গিমা দেখানো হয়েছে,যা খুবই দৃষ্টিনন্দন,
9) মন্দিরে ব্যবহৃত পাথরগুলি খাঁজ করে নীচেরটিকে উপরের সঙ্গে ইন্টারলকিং(interlocking) পদ্ধতিতে সংযুক্ত করা হয়েছে এবং সেখানে অন্য কোন পদার্থ ব্যবহৃত হয়নি,
10) বৃহদীশ্বর মন্দিরের 25টন ওজনের আটকোনা চূড়াটির ভার, একটি 80টন ওজনের গ্রানাইট পাথরের উপর সংরক্ষিত হয়েছে,
11) যে গ্রানাইট পাথর দিয়ে সম্পূর্ণ মন্দিরটি তৈরী, সেই পাথর তাঞ্জাভুরের পশ্চিমে 60কিমি দূরবর্তী তিরুচিরাপল্লী থেকে আনা হয়েছে,
12) মন্দিরে মহামন্ডপমের দেওয়ালের স্থাপত্যসমূহ:-
উত্তর দিক :- তাণ্ডব নৃত্যরত ভৈরব, মহিষাসুরমর্দিনী দেবী দুর্গা ও দেবী সরস্বতী,
দক্ষিন দিক :- প্রভূ বিষ্ণুদেব, ধনদাত্রী দেবী গজলক্ষ্মী ও সিদ্ধিদাতা গণেশের মূর্তিসমূহ,
13) সেযুগের দ্রাবীড়ীয় ব্রোঞ্জ সংস্কৃতির এক উত্তম নিদর্শন ব্রোঞ্জের নির্মিত শিবের 'নটরাজ' মূর্তি,
14) কুম্ভাভিষেকম্ : তাঞ্জাভুর মন্দিরের এক ধর্মীয় অনুষ্ঠান এই কুম্ভাভিষেকম্ এবং এই সময় মন্দির চূড়ায় প্রতিষ্ঠিত কুম্ভম্ এর উপরে জলাভিষেক করা হয়।
* কয়েকটি জ্ঞাতব্য বিষয় :-
* প্রধান দেবতা :- বৃহদীশ্বর শিব
* সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা :- 88m(289ft),
* খোলা ও বন্ধের সময় :-
6.00am to 12.30pm
4.00pm to 10pm
* বিশেষ দর্শন ফী :- Rs 05.00 each,
* পোষাকবিধি :- যে কোনও পোষাক(বিসদৃশ্য পোষাক ছাড়া),
* কিভাবে যাবেন :-
চেন্নাই থেকে দক্ষিন-পশ্চিমে প্রায় 350কিমি(220মাইল) ও জাতীয় মহাসড়ক 67, 45C, 226 ও 226ext. দ্বারা মন্দিরটি সংযুক্ত।
বৃহদীশ্বর মন্দির, গঙ্গাইকোণ্ডচোলপুরম্ প্রায় 70কিমি(43মাইল) এবং ঐরাবতেশ্বর মন্দির, দারাসুরাম প্রায় 40কিমি(25মাইল)
বিমানপথ :- তিরুচিরাপল্লী আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর, প্রায় 59 কিমি(37মাইল),
রেলপথ :- তাঞ্জাভুর জংশন রেলওয়ে স্টেশন থেকে মন্দিরের দূরত্ব মাত্র 1.4কিমি (1মাইল)।
* দর্শনীয় স্থান :-
1) তিরুভানঝোঝী মন্দির, 2) বাঙ্গারু কামাক্ষী মন্দির, 3) তাঞ্জাভুর রয়াল প্যালেস এণ্ড আর্ট গ্যালারী, 4) শ্রীমালাই আঞ্জেয়ানা মন্দির, 5) স্বামী মালাই মন্দির, 6) রামস্বামী মন্দির ও এরূপ আরও অনেক।
সুধী পাঠকবৃন্দ আশা করি লেখাটি আপনাদের ভালো লেগেছে। আমাদের লেখা পরিচিতজনদের মধ্যে শেয়ার করুন ও এরূপ কোন মন্দির সম্বন্ধে জানতে হলে আমাদের জানান। আমরা লেখার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করব। ধন্যবাদ।