Mystery of kailasanatha temple ellora in bengali
One of the jaw-dropping largest rock cut cave temple of the world, Cave No16, Ellora, Maharastra, India.
কৈলাশনাথ গুহা মন্দির, গুহা নং 16, পৃথিবীর মধ্যে বৃহত্তম গুহা মন্দির, ইলোরা, মহারাষ্ট্র, ভারত।
মহারাষ্ট্র ঔরঙ্গাবাদ থেকে মাত্র 28কিমি(18মাইল) দূরে ইলোরা গুহা মন্দির সমূহ তিনটি ধর্মীয় মতবাদের পরিপূরক প্রাগৈতিহাসিক যুগের এক অপূর্ব নিদর্শনরূপে গড়ে উঠেছিল।
বৌদ্ধ, জৈন ও হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদের উপর নির্ভর করে দেব-দেবীদের খোদিত মূর্তির উল্লেখযোগ্য সমাহার ঘটেছে এই তিন মতবাদের বিশ্বাসকে ভিত্তি করে।
ইলোরাতে মোট 34টি গুহা মন্দিরের মধ্যে, বৌদ্ধ ধর্মের 12টি, হিন্দু ধর্মের 17টি ও জৈন ধর্মের 5টি মন্দির, যা প্রাচীন ধর্মীয় সহাবস্থানের দিকচিহ্ন হিসাবে অবস্থিত।
ধর্মীয় অবস্থানক্রমে গুহাগুলি পঞ্চম থেকে দশম শতকের ভিতরে ভারতীয় স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত চরনন্দ্রী পাহাড়ে প্রস্তর খোদাই করে সেযুগের এক ঐতিহ্যবাহী নিদর্শনরূপে বিরাজমান।
প্রত্যেকটি ধর্মীয় মতবাদের নিজস্ব স্থাপত্যরীতিকে অনুসরণ করে ইলোরা গুহা মন্দিরসমূহ আজ বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসাবে UNESCO কর্তৃক 1983 সালে স্বীকৃতি লাভ করেছে।
ইলোরা স্থাপত্যরীতিতে তিন ধর্মের স্থাপত্যরীতির পার্থক্য স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়।
বর্তমান ইলোরা, অতীতের ভেলুরা বা এলুরা নামে পরিচিও ছিল।
ইলোরাকে এলাপুরা নামের বর্তমান রূপ বলে মনে করা হয়।
* কৈলাশনাথ গুহা মন্দির গুহা নং 16
কৈলাশনাথ গুহা, হিন্দুধর্মের ব্রাহ্মণ্য মতবাদ ও পুরাণ অনুসারে দেবাদিদেব শিবের আবাসস্থল কৈলাশ পর্বতের অনুসরণে ইলোরাতে পর্বত খনন করে নির্মান করা হয়েছিল।
ইলোরা, আজ বিশ্বে সর্বোৎকৃষ্ট গুহা মন্দির ও বৌদ্ধ মঠ হিসাবে চিহ্নিত যা দেশ বিদেশের ভ্রমণকারীদের আকৃষ্ট করে।
কৈলাশনাথ গুহা ভারতবর্ষের, প্রস্তরখোদিত বিখ্যাত মন্দির, যা স্থাপত্যরীতির প্রযুক্তিগত প্রয়োগের চরম উৎকর্ষ নিদর্শন হিসাবে, অষ্টম শতাব্দীতে ও নবম শতাব্দীর প্রথমভাগে নির্মিত হয়েছিল।
পৃথিবীর মধ্যে বিভিন্ন গুহা স্থাপত্যরীতির (architectural style) মধ্যে কৈলাশনাথ একশিলা খোদিত গুহা মন্দিরটি স্থাপত্য ও ভাস্কর্য শিল্পের এক চরম উৎকর্ষ নিদর্শনরূপে স্বীকৃত হয়েছে।
কৈলাশনাথ গুহা গভীরভাবে, সৌন্দর্য, শক্তি ও প্রতিভার এক আশ্চর্য মিলনস্থল।
সেযুগের শিল্প বোধসম্পন্ন ও রুচিশীল রাজন্যবর্গের বদান্যতায়, দানে ও উৎসাহে নির্মিত এই অত্যুৎকৃষ্ট গুহাশিল্প সেকালের শিল্পীদের ধারণা ও পরিকল্পনার এক সার্থক রূপায়ন।
বিগত শতাব্দীর ইতিহাসে স্থাপত্য ও ভাস্কর্যশিল্পের যে উন্নতি তা এই প্রস্তর খোদিত গুহা মন্দিরগুলির মাধ্যমে সার্থক রূপ পেয়েছে।
* কৈলাশনাথ গুহা মন্দির কে কবে তৈরী করেন?
অনবদ্য সৃষ্টি এই কৈলাশনাথ গুহাটি অষ্টম শতাব্দীতে রাষ্টকূট রাজবংশের আমলে নির্মিত হয়েছিল।
রাষ্ট্রকূট বংশের মহারাজ প্রথম কৃষ্ণ (756-773খৃঃ) এই গুহা মন্দিরসমূহ নির্মান শুরু করেন।
রাজা প্রথম কৃষ্ণ, কৈলাশনাথ মন্দির 760খৃঃ নির্মান করেন তার সাথে আরও কয়েকটি গুহা মন্দির নির্মান শুরু করেন, যা পরবর্তী রাজাদের দ্বারা সম্পূর্ণ হয়।
* কৈলাশনাথ গুহা মন্দিরের স্থাপত্যরীতি।
ইলোরার গুহাগুলি, বিভিন্ন ধর্মের মঠ ও মন্দিরসমূহে, রাষ্ট্রকূট ছাড়াও পল্লব, চালুক্য, স্থাপত্যশিল্প ও ভাস্কর্যের ছাপ লক্ষ্য করা যায়।
আশ্চর্যজনকভাবে কৈলাশনাথ মন্দিরটি, একটি একশিলা পর্বতের উপরিভাগ থেকে নীচের দিকে কেটে বার করা হয়েছিল।
সাধারণত গুহা স্থাপত্য সমূহ নির্মানে নীচের থেকে কেটে উপরের দিকে যাবার রীতি অনুসৃত হয়।
কৈলাশনাথ গুহা মন্দির দ্বিতল বিশিষ্ট যার উচ্চতা 45.72মিটার (150ফুট) ও পরবর্তীকালে ভূমি ভাগে অনেকগুলি বৈশিষ্ট্য যথা, মন্দির ও প্রস্তর মূর্তির সংযুক্তি লক্ষ্য করা যায়।
মন্দিরের প্রাঙ্গনে অবস্থিত মূল মন্দিরসহ তিনটি স্থাপত্য একটি উড়াল পুল দিয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।
কৈলাশনাথ মন্দির প্রাঙ্গনের তলদেশ(base) 82মি×46মি বিস্তৃত যা প্রাঙ্গনের প্রান্তভাগে একটি স্তম্ভের দ্বারা নির্মিত তিন তলার উচ্চতা বিশিষ্ট মন্দিরটিকে ধরে রেখেছে।
কৈলাশনাথ গুহা মন্দিরটির গঠনশৈলী (16নং গুহা) চান্দ্রী পাহাড়ের একশিলা (monolith) থেকে ইউ আকৃতিতে পাথর কেটে তৈরী একটি অপূর্ব সৃষ্টি।
একশিলা এই মন্দিরটি তৈরী করতে সময় লেগেছিল মাত্র 18বৎসর, সেযুগের স্থাপত্য শিল্পীরা আধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্য ছাড়াই শুধুমাত্র ছেনী ও হাতুড়ির দিয়ে সেটি সম্ভব করেছিলেন।
কৈলাশ মন্দিরের প্রবেশপথে প্রথমেই উল্লেখ্য হল তার সুউচ্চ চূড়াযুক্ত গোপুরম্ যার ভিতর দিয়ে অশ্ব-খুরাকৃতি প্রাঙ্গনে প্রবেশ করতে হয়।
এরপর রয়েছে নন্দী মণ্ডপ যা মূল মন্দিরে প্রবেশের পূর্বে অবস্থিত ও প্রভূ শিবের একমাত্র বাহন নন্দীষণ্ডের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়েছে।
সেখান থেকে 'গূঢ় মন্ডপম্' যেটি দর্শনার্থীদের বিমান পার হয়ে মূল মহাদেবের মন্দিরে প্রবেশ করতে পার হতে হবে।
* কৈলাশনাথের মন্দিরের প্রধান গর্ভগৃহ।
কৈলাশনাথ মূল মন্দিরটি একটি মঞ্চের উপরে দণ্ডায়মান যা দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
উপরের অংশ পেরিয়ে মূল কৈলাশনাথ মন্দিরে প্রবেশ করতে হবে।
উপরের অংশটির নাম 'অধিষ্ঠান' ও পরের অংশটিকে বলা হয় 'উপপীঠ' এবং যেগুলিকে প্রস্তরখোদিত এক সারি বৃহৎ আকৃতির হস্তীযূথ ধরে রেখেছে।
উপরের 'অধিষ্ঠান' মঞ্চে পৌঁছাতে নীচের 'উপপীঠ' অংশের বারান্দার দুটি দিকেই পাথরের সিঁড়ি রয়েছে।
* কৈলাশনাথ মন্দিরের প্রস্তর খোদিত দেওয়াল।
প্রভূ কৈলাশনাথ মন্দিরের দেওয়ালগুলিতে এক জটিল স্থাপত্য শিল্প রীতির প্রস্তর খোদিত দেব-দেবীর মূর্তি রয়েছে।
বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, হিন্দুতে ধর্মীয় পুরাণ ও মহাকাব্য যেমন, রামায়ণ, মহাভারতের, বিভিন্ন ঘটনাবলী অবলম্বনে খোদিত পাষাণ মূর্তি বর্তমানযুগেও তা যেন জীবন্ত হয়ে রয়েছে।
এই পাষাণ মূর্তিগুলির মধ্যে, প্রধান কয়েকটি হল, ধ্যানমগ্ন শিব, শিবের নটরাজ মূর্তি, রাবণ ও জলদেবী সম্পর্কে শিবকে সতর্ক করছেন পার্বতী, এ'ধরণের বহু খোদিত মূর্তি।
সুতরাং বলা যায় যে, সেযুগে ভারতীয় স্থাপত্য, শিল্প ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে প্রযুক্তিবিদ্যার প্রয়োগের নিপুনতার দিক থেকে এক অবিশ্বাস্য উৎকর্ষতার চরম শিখরে পোঁছেছিল।
ইলোরার কৈলাশনাথ গুহা মন্দির তারই এক অন্যতম নিদর্শন হিসেবে আজও স্বমহিমায় বিরাজ করছে।
* কৈলাশনাথ গুহা ও কিছু বিস্ময়।
যাই হোক না কেন, স্থাপত্য রীতি ও ধর্মীয় বিষয় ছাড়াও একি বিস্ময়কর অবদান সেযুগের শিল্পী ও নকশা কারীরা আমাদের জন্য সৃষ্টি করেছিলেন যা আজও শিল্পী বা স্থাপত্যবিদদের নিকট কল্পনাতীত?
এই বিস্ময়কর কালজয়ী স্থাপত্য নিদর্শন, সে যুগের শিল্পীরা শুধুমাত্র ছেনী, হাতুড়ির সাহায্যে উন্নত প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি ছাড়াই কিভাবে সৃষ্টি করলেন?
বর্তমান প্রযুক্তিবিদদের ধারণা যে আধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে কৈলাশনাথ মন্দির তৈরী করতে একশ' বছর লাগবে, যা কিভাবে মাত্র আঠারো বছরে তৈরী হল?
মন্দিরের পাথর খোদাই করার ফলে যে টুকরো বেরিয়েছে, তার পরিমাণ দেড় লক্ষ থেকে চার লক্ষ টন, এই এলাকায় তার চিহ্ন কোথাও নেই, কেন?
সেই টুকরোগুলি সরাতে যে সংখ্যক লোক ও সময় লাগবে তা কল্পনারও অতীত।
এছাড়া আরও অনেক এ ধরণের প্রশ্নের উত্তর আজও আমাদের অজানা ও তা কোনদিন প্রকাশিত হবে কিনা, কে জানে!
* খোলা ও বন্ধের সময়সূচী (পরিবর্তন সাপেক্ষ) :-
ইলোরার কৈলাশনাথ গুহা মন্দির সকাল 6.00টায় খোলা হয় ও সন্ধ্যা 6.00টায় বন্ধ থাকে।
* ইলোরা গুহা মন্দিরসমূহ প্রতি মঙ্গলবার বন্ধ থাকে।
* যাবার উৎকৃষ্ট সময় :-
নভেম্বর - মার্চ মাস।
* প্রবেশমূল্য(পরিবর্তন সাপেক্ষ) :-
ভারত ও কিছু এশিয়ার দেশসমূহের নাগরিকদের জন্য :- INR 35/= ও বিদেশীদের জন্য ;- INR 550/=
কিভাবে যাবেন :-
বিমানপথ :- ঔরঙ্গাবাদ বিমান বন্দর (35কিমি) যা ভারতের মুম্বাই, দিল্লী, হায়দরাবাদ প্রভৃতি শহরের সঙ্গে যুক্ত।
রেলপথ :- ঔরঙ্গাবাদ রেল স্টেশন (28কিমি)। এছাড়া, নিকটবর্তী দৌলতাবাদ রেল স্টেশন রয়েছে।
সড়কপথ :- ঔরঙ্গাবাদ সেণ্ট্রাল বাস স্ট্যাণ্ড থেকে মহারাষ্ট্র রাজ্য পরিবহন সংস্থার লাক্সারী বাসযোগেইলোরাতে যাওয়া যাবে। ভাড়ার ট্যাক্সিও পাওয়া যায়।
* দর্শনীয় স্থানসমূহ :-
1) ঘৃষ্ণেশ্বর শক্তিপীঠ, 2) অজন্তা গুহা সমূহ, 3) ইলোরার বৌদ্ধ ও জৈন গুহা সমূহ, 4) বিবি কা মকবারা, ঔরঙ্গাবাদ (যাকে দাক্ষিনাত্যের তাজ বলা হয়। ঔরঙ্গাবাদ থেকে দূরত্ব মাত্র 3কিমি), 5) দৌলতাবাদ ফোর্ট, 6) ঔরঙ্গাবাদ কেভস্ ও আরো অনেক। সুধী পাঠকবৃন্দ, ইলোরার কৈলাশনাথ গুহা সম্বন্ধে কিছু তথ্য এই লেখায় সন্নিবেশিত হয়েছে। ভালো লাগলে পরিচিতজন ও ভ্রমণার্থী বন্ধুদের শেয়ার করুন ও মন্তব্য করুন। ধন্যবাদ।