Mystery of sun temple modhera in bengali
প্রাচীন নভোবস্তুবিদ্যার প্রয়োগক্ষেত্র, মধেরা সূর্যমন্দির।
মধেরা, জেলা- মহেসানা, গুজরাট, ভারত।
A successfull application of astrophysical science in ancient India.
ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানের ন্যায় গুজরাটের মধেরাতেও অনুরূপ একটি সূর্যদেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত মন্দির পুষ্পবতী নদীর তীরে নির্মিত হয়েছিল।
একবিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগে সারা বিশ্বে নভোবস্তুবিদ্যার প্রভূত উন্নতি হয়েছে, যার প্রয়োগ, একাদশ শতাব্দীতে ভারবর্ষের বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় পরিবেশের মাধ্যমে সার্থকভাবে ঘটেছিল।
সারা বৎসরের মধ্যে এক বিশেষ তিথিতে সূর্য ও পৃথিবীর স্থানিক অবস্থানের সূক্ষ্ম গাণিতিক প্রয়োগ ভারতের বিভিন্ন স্থানে পরিলক্ষিত হয়।
সেগুলির মধ্যে কর্ণাটকের গাভীপুরম্ গুহা মন্দির, উড়িষ্যার কোনারক সূর্য মন্দির ও তার সাথে গুজরাটের মধেরা সূর্য মন্দিরটিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
* Mystery of sun temple modhera in bengali
হিন্দুধর্মে মধেরা সূর্যমন্দিরটির ক্ষেত্রে একাদশ শতাব্দীর জ্যোতিষজ্ঞানের এক আশ্চর্য প্রয়োগ নৈপূন্য লক্ষ্য করা যায়।
মন্দিরটির ভৌগলিক দিক থেকে অবস্থান 23.6ডিগ্রী অক্ষাংশ, যা কর্কটক্রান্তি রেখার কাছাকাছি এবং কর্কটক্রান্তি রেখা (23.5 ডিগ্রী) গুজরাটের জসদান শহরের উপর দিয়ে গিয়েছে।
* পুরাণে উল্লিখিত স্থান, মধেরা।
লঙ্কার রাক্ষসরাজ রাবণ ছিলেন ব্রাহ্মণ সন্তান, তাঁকে হত্যা করে, শ্রীরামচন্দ্র পত্নী সীতাদেবীকে উদ্ধার করেন।
রাবণ ছিলেন পুলস্ত্য ঋষির পৌত্র ও ঋষি বিশ্বশ্রবা এবং রাজকন্যা কৈকেশীর পুত্র।
তার ফলে শ্রীরামচন্দ্র ব্রহ্ম হত্যার পাপ করেন ও তার থেকে মুক্তি কামনায়, তিনি বিশেষভাবে সচেষ্ট হন।
প্রাচীন ব্রহ্ম পুরাণে উল্লেখ আছে যে, ঋষি বশিষ্ট্য শ্রীরামচন্দ্রকে ব্রহ্ম হত্যার পাপ থেকে মুক্তির জন্য প্রাচীন স্থান ধর্মারণ্যে গিয়ে তপস্যা করার উপদেশ দেন।
ধর্মারণ্য স্থানটি বর্তমানের মধেরা বলে মনে করা হয়, কারণ, তিনি এখানে তাঁর পত্নী সীতাদেবীর নামে সীতাপুর গ্রাম প্রতিষ্ঠা করেন ও তাছাড়াও আরও কিছু নিদর্শন এখানে দেখা যায়।
* মধেরা সূর্য মন্দিরের ধ্বংস ও পুনর্গঠন।
গজনীর সুলতান মামুদ 1024-25খৃঃ যখন গুজরাট আক্রমন করে সোমনাথ মন্দির ধ্বস ও লুন্ঠন করেন, সেই সময় মধেরার সূর্য মন্দিরসহ প্রায় 108টি মন্দিরও লুন্ঠিত হয়।
সেই সময় চালুক্য বংশীয় রাজা প্রথম ভীমদেব প্রায় 20'000 সৈন্যদল নিয়ে বাধা দেবার চেষ্টা করেও অসফল হন।
বহু ঐতিহাসিকের মতে, রাজা ভীমদেব তাঁর সেই বীরত্বপূর্ণ বাধাদানের কাহিনী স্মরণীয় করে রাখতে মন্দিরটি নির্মান করেন।
পরবর্তীকালে আলাউদ্দিন খলজী 1296-1316 খৃঃ মন্দিরটি ধবংস ও লুন্ঠন করেন।
তবে একথা অনস্বীকার্য যে তার পরেও আজও গাণিতিক ও জ্যোতিষশাস্ত্র সম্মত নিদর্শন এখানে যা রয়েছে তা সেযুগের স্থপতিদের বিজ্ঞতার পরিচয় দেয়।
মন্দির প্রকোষ্ঠের পশ্চিম দেওয়ালে দেবনাগরী হরফে লেখা 'বিক্রম সম্বৎ 1083' যা খৃষ্টীয় 1026-27 বৎসরের সঙ্গে সমান এবং এছাড়া অন্য কোন সাল-তারিখ আর এখানে পাওয়া যায় না।
* মন্দিরের নির্মান কৌশল ও স্থাপত্যশৈলী।
সম্পূর্ণ মন্দির প্রাঙ্গনটি একই অক্ষের উপর প্রধান তিনটি ভাগে বিভক্ত, প্রথমে সূর্যকুণ্ড, মধ্যে সভামণ্ডপ ও তারপর মূল মন্দির বা গর্ভগৃহ অবস্থিত।
* সূর্যকুণ্ড বা রামকুণ্ড
সূর্যকুণ্ড বা রামকুণ্ড, একটি আয়তাকার পবিত্র জলাধার যার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ যথাক্রমে 50.6m×36.6m সেটি প্রান্তভাগে অবস্থিত এবং সভামণ্ডপের পূর্বদিকে নির্মিত।
মন্দিরে পূজার্চনার জন্য আগত ভক্তবৃন্দ এই কুণ্ডে স্নান করে পরিশুদ্ধ হত।
কুণ্ডটিতে অবতরণের জন্য সুগঠিত সিঁড়ি ও তার পার্শ্বদেশে 108টি বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তিসহ মন্দির ছিল যা হিন্দু জপমালার 108টি ক্ষুদ্র রুদ্রাক্ষের প্রতীকস্বরূপ।
* সভামণ্ডপ
অক্ষটির মধ্যভাগে অবস্থিত চতুর্দিক খোলা সভামণ্ডপটির প্রবেশ দ্বারে দুটি বিচিত্র ও জটিল জ্যামিতিক নকশা ও দ্বাপর যুগে শ্রীকৃষ্ণলীলা ও মহাভারত থেকে, ত্রেতা যুগে রামায়ণ থেকে এবং বিভিন্ন দেবদেবীর কারুকার্যমণ্ডিত চিত্রসমন্বিত তোরণ আজও দেখা যায়, মনে করা হয়,ভক্তগণ সূর্যকুণ্ডে স্নান করে শুদ্ধভাবে এখানে সমবেত হত।
সভামণ্ডপে 52টি জটিল জ্যামিতিক নকশা সন্বলিত খিলান বা স্তম্ভ একটি আয়তাকার ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছে যা সারা বৎসরের 52টি সপ্তাহের প্রতীক হিসাবে নির্মিত হয়েছিল।
পরবর্তীকালে, সভামণ্ডপের সামনের অংশ মুসলিম আক্রমণে ধ্বংসপ্রাপ্ত হলেও তার কিছু অংশ পুনর্নির্মিত হয়।
সভামণ্ডপের দেওয়ালে দ্বাদশ কুলুঙ্গী বা কুঠুরী, সৌর বৎসরের দ্বাদশ মাসের প্রতীক এবং এখানে সূর্যদেবের দ্বাদশ রূপ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
* গূঢ় মণ্ডপ বা গর্ভগৃহ
মুল সূর্যমন্দিরের গর্ভগৃহটি গূঢ়মণ্ডপ হিসাবে তৈরী করা হয়েছিল, যার ভিতরের পরিমাপ হল,51'9" × 25'8" এবং সেটি সমভাবে দ্বিধা বিভক্ত, যার একটি ভাগ গুঢ়মণ্ডপ ও অপরটি মূল মন্দির বা গর্ভগৃহ যার ছাদটি সম্পূর্ণ ভাবে ভেঙে গিয়েছে।
গর্ভগৃহটি বর্গাকৃতি, যার ভিতরের পরিমাপ 11বঃফুঃ ও দেওয়ালগুলি মসৃন, কিন্তু বাহিরের দেওয়ালগুলি বিভিন্ন চিত্র সম্বলিত।
মন্দিরগাত্রে খোদিত চিত্রসমূহে আশ্চর্যজনক ভাবে মানব জীবনের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বিভিন্ন দিককে তুলে ধরা হয়েছে।
দরজাটির কপাটে সূর্যদেবের মূর্তি খোদিত আছে, যার চারিপাশে নর্তকীগণ ও প্রণয়রত দম্পতিগণ ঘিরে ছিল, যা বর্তমানে প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে।
মন্দির প্রদক্ষিণ করার জন্য উপরে প্রস্তর নির্মিত সুদৃশ্য নকশা সম্বলিত ছাদ বিশিষ্ট 'প্রদক্ষিণ মার্গ', যা গর্ভগৃহ ও গূঢ়মণ্ডপের বাহিরের দেওয়াল সংলগ্ন স্থানে নির্মিত রয়েছে।
প্রদক্ষিণ মার্গের ছাদের উপর শিখরটি বর্তমানে বিলুপ্ত হয়েছে।
* মধেরা সূর্য মন্দিরের বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
সরোবরে কমল বা পদ্মফুল সূর্যোদয়ের সাথে ফোটে ও সূর্যাস্তের সাথে দলগুলি বন্ধ হয়ে যায়।
মন্দিরটি একটি সম্পূর্ণ উল্টানো পদ্মফুলের স্তম্ভমূলের উপরে একটি চতুষ্কোন পীঠের উপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছে।
মন্দিরের গর্ভগৃহটি এমনভাবে নির্মান করা হয়েছিল যাতে সূর্যদেবের উপর প্রথম প্রভাতরশ্মি পতিত হয়।
মন্দিরটি সূর্যদেবতার উদ্দেশ্যে নিবেদিত একটি পবিত্রস্থান, যেখানে প্রতি বৎসর 21শে জুন তারিখে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তকালে সূর্যালোক রথারূঢ় সূর্যদেবের একটি চিত্রের উপর পতিত হয়ে থাকে।
সপ্ত অশ্ব সম্বলিত রথের সারথিরূপে রথারূঢ় অরুণদেবতা যা মূলগতভাবে সপ্তাহের সাতটি দিনকেই নির্দেশ করে।
রথের চতুর্থ অশ্বের উপর আসীন সূর্যদেব এবং 15ফুট গভীর একটি কূপ যা স্বর্ণমুদ্রা দ্বারা পরিপূর্ণ ছিল এবং তার উপরিস্থ এই সম্পূর্ণ স্থাপত্যটি ছিল স্বর্ণনির্মিত।
চালুক্য রাজাদেরকুলদেবতা
গজনীর সুলতান মামুদ এই সম্পূর্ণ স্বর্ণ ভাষ্কর্যটিসহ কূপ মধ্যস্থ স্বর্ণমূদ্রা লুন্ঠন করে নিয়ে যায়।
বর্তমানে মন্দিরটিতে কোন পূজার্চনা করা হয়না এবং এটি একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসাবে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার (Archeological Survey of India) তত্বাবধানে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়।
* মন্দির :- মধেরা সূর্য মন্দির,
* দর্শনের সময় :- সকাল 7টা থেকে বিকাল 6টা,
* স্থাপত্যরীতি :- মারু গুর্জর বা চালুক্য স্থাপত্যরীতি,
* কার তৈরী :- সোলাঙ্কি রাজা প্রথম ভীমদেব,
* সম্মুখভাগ :- পূর্বমুখী,
* প্রবেশমূল্য :- ভারতীয়দের জন্য 30 INR (15 বৎসরের নীচে বালক বালিকাদের কোন প্রবেশমূল্য লাগেনা)।
বিদেশীদের জন্য INR 200.
* কখন যাবেন :- অক্টোবর থেকে মার্চ (গুজরাটে শীতকালীন ভ্রমণ খুবই উপভোগ্য)। মধ্য জানুয়ারীতে মধেরা সূর্য মন্দিরে, দ্য টুরিসম্ কর্পোরেশন অফ গুজরাট (The Tourism Corporation India), কর্তৃক আয়োজিত হয় তিনদিন ব্যাপী নৃত্য উৎসব যা 'উত্তরার্ধ মহোৎসব' নামে পরিচিত। যে সময় ভ্রমণ পরিকল্পনা করা যেতে পারে।
* মন্দিরটি আহমেদাবাদ থেকে 102কমি এবং জেলাশহর মহেসানা থেকে 25কিমি দূরত্বে অবস্থিত।
কিভাবে যাবেন :-
বিমান বন্দর :- আহমেদাবাদ,
রেল পথ :- মেহসানা রেল স্টেশন, 28কিমি/18.4মাইল,
সড়কপথ :- মধেরা সড়কপথে ভারতের সমস্ত শহরের সঙ্গে সংযুক্ত।
দর্শনীয় স্থান :-
1) গণপতি মন্দির, 2) রামজী মন্দির, 3) খোদিয়ার মতাজী মন্দির, 4) মহেশ্বরী মাতা মন্দির, ইত্যাদি।
সুধী পাঠকবৃন্দ, লেখাটি পড়ে ভালো লাগলে পরিচিত জনদেরকে শেয়ার করুন ও একটি মন্তব্য করুন। ধন্যবাদ।