Temple of Devi Tripureswari
মাতা ত্রিপুরেশ্বরী মন্দির
উদয়পুর, জেলা গোমতী, ত্রিপুরা,
ভারত
(Temple of Devi Tripureswari)
Udaypur, Dlst. Gomati
Tripura, Bharat.
সুধী পাঠকবৃন্দ! আজ আমরা আপনাদের নিয়ে যাব ত্রিপুরা রাজ্যে। যে রাজ্যে অতুলনীয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে আপনারা উপভোগ করবেন এক পূণ্যতীর্থ শক্তিপীঠে দেবী ত্রিপুরেশ্বরী মাতার দর্শন ও পূজনের অনাবিল আনন্দ। তবে চলুন ঘুরে আসি ত্রিপুরা।
দেবী ত্রিপুরাসুন্দরী মন্দির
কূর্মপৃষ্ঠ শক্তিপীঠ
ত্রিপুরা রাজ্যে মা ত্রিপুরেশ্বরী মন্দিরটি একমাত্র শক্তিপীঠ হিসাবে পরিগণিত হয়। স্থানীয়ভাবে মাতা ত্রিপুরেশ্বরী ত্রিপুরার অধিষ্ঠাত্রী দেবী জ্ঞানে পূজিতা হন।
ত্রিপুরা রাজ্যের প্রাচীন রাজধানী উদয়পুর থেকে কিছুদূরে এক অনুচ্চ পাহাড়ের চূড়ায় মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত।
পাহাড় চূড়াটি অনেকটা কূর্ম(কচ্ছপ) পৃষ্ঠের ন্যায় দেখতে, যা শক্তি সাধনার খুবই উপযুক্ত স্থান বলে তন্ত্রসাধকদের অভিমত। তাই এই শক্তিপীঠকে কূর্মপৃষ্ঠ শক্তিপীঠ বলা হয়।
দেবী ত্রিপুরেশ্বরী মন্দিরটি এখানে মাতাবাড়ি মন্দির নামে পরিচিত। এই মন্দিরে স্থানীয় পুরোহিতগণই মায়ের পূজা অর্চনা করেন। এই শক্তিপীঠটিও 51 শক্তিপীঠের মধ্যে বেশ গুরুত্বপূর্ণ বলে সাধক ও পূণ্যার্থীগণের নিকট বিবেচিত হয়ে থাকে।
দেবী সতীর অঙ্গখণ্ড
কথিত আছে,এখানে দেবীর দক্ষিন পদ খণ্ড পতিত হয়েছিল।
মা ত্রিপুরেশ্বরী শক্তিপীঠে মায়ের অভিভাবক ও রক্ষক রূপে মহাদেব, ত্রিপুরেশ নামে নিত্য পূজিত হন।
মহারাজ ধন্যমাণিক্য
ত্রিপুরার মহারাজ ধন্যমাণিক্য দেববর্মা 1501 খৃঃ এই ত্রিপুরেশ্বরী মন্দিরটি স্থাপন করেছিলেন। কথিত আছে, তিনি প্রকৃতপক্ষে প্রভূ বিষ্ণুর প্রতিষ্ঠা মানসে একটি মন্দির নির্মান করেন।
কিন্তু, তিনি এক রাত্রে দেবীর একটি স্বপ্নাদেশ পান। দেবী তাঁকে এক বিশেষ স্থানে মন্দির নির্মান ও পূজা অর্চনার এবং অধূনা বাংলাদেশের চট্টগ্রাম থেকে মায়ের কালো কষ্টিপাথরে নির্মিত এক প্রতিমা নিয়ে আসতে আদেশ দেন।
পরদিন, মহারাজ খোঁজ নিয়ে দেখেন যে, সেই স্থানে তিনি বিষ্ণু মন্দির পূর্বেই তৈরী করেছেন। তিনি দ্বিধাগ্রস্থ হন। প্রভূ বিষ্ণু ও দেবী পার্বতী কখনও একই মন্দিরে অবস্থান করতে পারেন না।
পররাত্রে, তিনি একই আদেশ পান ও সেই পূণ্যভূমিতে একই মন্দিরে দেবী পার্বতীকে কালিকারূপে ও প্রভূ বিষ্ণুকে প্রতিষ্ঠা করেন এবং স্বপ্নাদেশ অনুসারে মুর্তি আনয়ন করে মাকে সেখানে পূজার ব্যবস্থা করেন। তিনি বুঝতে পারেন যে বিষ্ণু ও শক্তি এক, দেবতা হিসাবে কোনও পার্থক্য নাই। আজও সেই প্রথা প্রচলিত আছে।
ত্রিপুরাসুন্দরী দেবীর মন্দিরের গঠনশৈলী
দেবীর মন্দিরের গঠনশৈলী মধ্যযুগীয় বাংলা ধাঁচের চারচালা হলেও তার মধ্যে ত্রিপুরার নিজস্ব ধাঁচের মিশ্রন অবশ্যই লক্ষ্য করা যায়।
মন্দিরটি শঙ্কু আকৃতির গম্বুজ বিশিষ্ট বাংলা চতুস্কোন কুঁড়েঘরের মতো এবং ত্রিস্তরীয় ঘনকাকৃতির একটি অট্টালিকা, যা বাংলা "একরত্ন" ধরণে গঠিত। সর্বোচ্চ স্তরে সপ্ত কলস ও তার উপরে রৌপ্যদণ্ডে দেবীর ধ্বজ উড্ডীয়মান।
মাতা ত্রিপুরেশ্বরী দেবী
মন্দিরের গর্ভগৃহে মাতা ত্রিপুরেশ্বরী দেবীর কালো কষ্টিপাথরের নির্মিত একই রকমের দু'টি মূর্তি বিরাজমানা।
তার মধ্যে একটি মূর্তি প্রায় 5ফুট উচ্চ ও তাঁকেই মা ত্রিপুরেশ্বরী বলা হয়।
অপর মূর্তিটি কিছুটা ছোট আকৃতির, তাই, ত্রিপুরাবাসীগণ তাঁকে "ছোটমা" বলে ও সেটি 2ফুট উচ্চ। তাঁকে মা চণ্ডী হিসাবে পূজা করা হয়।
কথিত আছে, রাজবংশের রীতি অনুযায়ী ত্রিপুরার রাজাগণ যখন কোন যুদ্ধে যেতেন, সেসময় মা চণ্ডীর ছোট মূর্তিটি সৌভাগ্যলক্ষ্মী রূপে সঙ্গে নিয়ে যেতেন, যাতে তাঁরা বিজয়ী হতে পারেন।
অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে সামসের গাজী উদয়পুর আক্রমণ করেন ও দখল করেন। তিনিও দেবীর মন্দিরে পূজা দিয়েছিলেন বলে তাঁর গাজীনামা গ্রন্থে উল্লেখ পাওয়া যায়।
এই মন্দিরে শাক্ত, শৈব, বৈষ্ণবসহ সমস্ত ধর্মের লোক, এমন কি মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষজনও পূজা দেন। তাঁরা তাঁদের ক্ষেতের প্রথম ফসল, গাছের প্রথম ফল, গরুর দুধ প্রভৃতি দিয়ে মায়ের মন্দিরে পূজা দেন। উপজাতি জনগোষ্ঠীর লোকেরাও দেবীকে যথেষ্ট ভক্তি ও শ্রদ্ধা করেন।
মাতা ত্রিপুরেশ্বরী মন্দিরে পূর্বে নিয়মিত ছাগবলি দেবার প্রথা প্রচলিত থাকলেও, গত অক্টোবর 2019 থেকে সেই প্রথা নিষিদ্ধ হয়েছে।
মন্দির খোলা ও বন্ধের সময়সূচী
গ্রীষ্মকালে :- (1লা মার্চ - 15ই অক্টো)
সকাল : 5.00am - 9pm
শীতকালে :- (16ই অক্টো - 28শে
ফেব্রু)
সকাল : 5.30am - 8.30pm
মন্দিরে কোন প্রবেশ মূল্য নাই।
মন্দির প্রত্যহ খোলা থাকে।
কল্যাণ সাগর
কল্যাণ সাগর নামে একটি বিস্তীর্ন সরোবর মন্দিরের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত।
যার বিস্তার প্রায় 6.4 একর, লম্বায় 224 গজ ও চওড়ায় 160 গজ। পাহাড়ের পাদদেশ থেকে বিস্তৃত এই বিশাল জলভাগ মন্দিরের সৌন্দর্য বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
জলাশয়টি জলচর জীব বৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ। এখানে এক বিরল প্রজাতির কচ্ছপ প্রচুর পরিমানে দেখা যায়। এছাড়াও, বিভিন্ন বিরল প্রজাতির জলচর প্রানীও এই জলাশয়ে বাস করে। জলচর জীবসহ এই সরোবরটিকে পূণ্যতোয়া হিসাবে গণ্য করে পূণ্যার্থী ভক্তগন মুড়ি, বিস্কুট ইত্যাদি প্রানীদের খাবার জন্য দিয়ে থাকে এবং সেটিকে পূণ্যকাজ বলে জ্ঞান করে। অন্যান্য স্থানের ন্যায় এখানেও মন্দিরের রাস্তার দুপাশে সজ্জিত দোকানসমূহে মায়ের পূজা প্রদানের জন্য জবাফুল,মালা, মিষ্টি, প্যাঁড়া,(ক্ষীরর তৈরী শুকনো সুস্বাদু সন্দেশ,প্যাঁড়া সন্দেশে পেটেণ্ট গ্রহনের বিষয়ে ত্রিপুরা রাজ্য সরকার উদ্যোগী হয়েছে) ধূপ,সিন্দুর প্রভৃতি পাওয়া যায়।
এখানে মৎস্য ও কচ্ছপ শিকার নিষিদ্ধ। এছাড়া, পলিথিন ব্যাগ জাতীয় বস্তু এই মাতাবাড়ি মন্দির এলাকায় 1998 সাল থেকে বহন করাও মন্দির কমিটি নিষিদ্ধ করেছে। পরবর্তীকালে, ত্রিপুরা স্টেট পলিউশন কন্ট্রোল বোর্ড (TSPCB) 21শে জানুয়ারী 2002 তারিখে সারা ত্রিপুরা রাজ্যে পলিথিনের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এই সরোবরকে দূষণমুক্ত রাখার ও জলের বিশুদ্ধতা রক্ষায় মাতাবাড়ি মন্দির কমিটি ও ত্রিপুরা রাজ্য সরকার যথেষ্ট উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
কতিপয় দর্শনীয় স্থান সমূহ:-
1) উনাকাটি গুহা ও শিবমূর্তি
2) নীরমহল প্রাসাদ
3) উজ্জয়ন্ত প্রাসাদ
4) সিপাহিজলা বন্যপ্রানী সংরক্ষিত অরন্য
5) অমরপুরা পিকনিক স্পট
6) জামপুই পর্বত, ইত্যাদি।
কিভাবে যাবেন :-
বিমানপথ :-
আগরতলা,ত্রিপুরা বিমান বন্দর। ভারতবর্ষের সমস্ত প্রধান প্রধান নগর থেকে বিমানপথে সংযুক্ত। এখান থেকে মাতাবাড়ি মন্দির 55 km।
রেলপথ :-
ত্রিপুরা বর্তমানে ব্রড গেজ রেলপথ দ্বারা সংযুক্ত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন রাজ্যের প্রধান শহরগুলির সাথে উদয়পুর রেলস্টেশনের যোগাযোগ বর্দ্ধিত হয়েছে।
সড়কপথ :-
ত্রিপুরা ও মাতাবাড়ি মন্দিরের সাথে দেশের সমস্ত শহরগুলি উত্তমরূপে সংযুক্ত।
প্রিয় পাঠকবৃন্দ! আপনাদের আরও কিছু জানার থাকলে, আমাদের জানান। আমরা উত্তর দিতে সচেষ্ট থাকব। ধন্যবাদ।