Bhramari Devi Shaktipeetha
On the bank of Trisrota or Tista River Jalpaiguri, West Bengal,
India
ভ্রামরী দেবী শক্তিপীঠ
ত্রিস্রোতা বা তিস্তা নদীর কূল,
জলপাইগুড়ি, পশ্চিম বঙ্গ,
ভারত।
সতীপীঠ শক্তিপীঠ
সনাতন হিন্দুধর্মে শক্তিপীঠের একটা বিশেষ স্থান আছে বলে মনে করা হয়। ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, সিংহল, নেপাল, চীন প্রভৃতি দেশে অবস্থিত 51 শক্তিপীঠ সেই তত্ত্বই প্রমান করে।
দক্ষকন্যা দেবী সতী বিনা নিমন্ত্রনে পিতার আয়োজিত শিবহীন যজ্ঞে উপস্থিত হন। কিন্তু, পিতার মুখে পতি নিন্দা শুনে প্রজ্জ্বলিত যজ্ঞাগ্নিতে প্রাণ বিসর্জন করেন। ক্রোধান্বিত শিব যজ্ঞস্থলে উপস্থিত হন ও নিজ জটা থেকে সৃষ্ট কালভৈরবকে দক্ষকে হত্যার আদেশ দেন।
তিনি মৃত সতীর দেহ কাঁধে নিয়ে তাণ্ডবনৃত্যরত অবস্থায় ভূমণ্ডলে ভ্রমণ করতে থাকেন। তখন প্রভূ বিষ্ণু সুদর্শন চক্র দিয়ে সতীর দেহ 51টি খণ্ড করেন। সেই 51টি খণ্ড যে সব স্থানে পতিত হয় সেখানে দেবীর পরাশক্তি বিরাজমান বলে হিন্দু ধর্মে উল্লেখ আছে। সেগুলি দেবীর শক্তিপীঠ বলে হিন্দুদের বিশ্বাস। দেবী বিভিন্ন নামে সেখানে অবস্থান করেন। এছাড়া, ঐস্থানসমূহে দেবীর রক্ষক ও অভিভাবক হিসাবে মহাদেবও অবস্থান করেন বলে কথিত আছে।
শক্তিপীঠকে ঘিরে শাক্ত, শৈব, বৈষ্ণব প্রভৃতি ধর্মের সাধকগণ, যারা সাধনার দ্বারা সিদ্ধিলাভ কামনায় তন্ত্র মতে দেবী শক্তির সাধনা করে ও পূণ্যার্থী ভক্তজনের হৃদয়ে, মাতৃস্বরূপা কালিকা দেবী বিরাজ করেন।
বিভিন্ন পুরাণ ও প্রাচীন কাব্য সাহিত্যে শক্তিপীঠ ও তার মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে, যা আজও প্রচলিত আছে।
ভ্রামরী দেবী মন্দির
দেবী সতী তথা পার্বতী শক্তি স্বরূপিনী ও সদা চিদানন্দময়ী। তাঁর কৃপালাভে ধর্ম পিপাসু হিন্দু পূণ্যার্থী ভক্তজন দেবীর পূজার্চনা করে থাকেন। বিভিন্ন শক্তিপীঠে দেবী ভিন্ন ভিন্ন নামে পূজিতা হন।
আজ আমরা এখানে পশ্চিম বঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার একমাত্র শক্তিপীঠ ভ্রামরী দেবীর কাহিনী আলোচনা করব।
দেবী ভ্রমর পরিবেষ্টিত কালিকারূপে বিরাজমানা। তাঁর চারি হস্তে গদা, ত্রিশূল, খড়্গ ও ঢাল শোভিত। গর্ভগৃহে তাঁর দক্ষিন পার্শ্বে মহাদেব ও অনুচর নন্দী অবস্থান করছেন।
এখানে দেবীর বাম পদ পতিত হয়েছিল বলে কথিত আছে। দেবী ভ্রামরী মাতা। দেবীর অভিভাবক শিব অম্বর/ ঈশ্বর নামে নিত্য পূজিত। মন্দিরটি লাল পাথরের তৈরী একচালা বিশিষ্ট।
পুরাণ কথা
স্বর্গের আধিপত্য নিয়ে দেবতা ও অসুরদের মধ্যেকার বিবাদ, যুদ্ধ-বিগ্রহ লেগেই থাকতো। বিভিন্ন শাস্ত্র ও পুরাণ কাহিনীতে তা বর্ণিত হয়েছে।
"দেবী ভাগবত পুরাণ", "দেবী পুরাণ" প্রভৃতি গ্রণ্থে দেবী ভ্রামরী মাতার কাহিনী বর্ণিত হয়েছে।
অরুণাসুর নামে এক অসুর দেবতাদের পরাস্ত করে স্বর্গরাজ্য অধিকার করার সংকল্প করে। তার বাসনা অনুযায়ী প্রভূ ব্রহ্মাকে তুষ্ট করার লক্ষ্যে কঠোর তপস্যা শুরু করে।
সাধনার প্রথম দশ সহস্র বৎসরে সে প্রানায়াম ও শুধুমাত্র পত্রভক্ষন করে সাধনা করে। দ্বিতীয় দশ সহস্র বৎসরে শুধুমাত্র কয়েক বিন্দু জল ছাড়া অন্য কিছু গ্রহণ করেনা। তৃতীয় দশ সহস্র বৎসরে সে বায়ু ভক্ষন করে তপস্যা করে। চতুর্থ সহস্র বৎসরে উপবাস করে সাধনা করে। তখন তার সম্পূর্ণ দেহে অগ্নি প্রজ্জ্বলিত হয়ে ওঠে।
তপস্যাক্লিষ্ট অরুণাসুরের নিকট ব্রহ্মা উপস্থিত হয়ে বর প্রার্থনা করতে বলেন। অসুর অমরত্ব প্রার্থনা করলে ব্রহ্মা রাজী হন না।
তখন সে প্রার্থনা করে যে কোন দ্বিপদ বা চতুস্পদ জীবের হাতে তার মৃত্যু হবে না। ব্রহ্মা রাজী হয়ে তাকে সেই বর প্রদান করেন।
এরপর সে সমস্ত অসুরদের নিয়ে স্বর্গরাজ্য আক্রমণ করে। স্বর্গচ্যূত দেবগণ কৈলাস পর্বতে গিয়ে মহাদেবের নিকট পরিত্রানের উপায় প্রার্থনা করে।
স্থির হয়, দেবী পার্বতী অরুণাসুরের সঙ্গে যুদ্ধ করবেন এবং ষট্ পদ বিশিষ্ট ভ্রমরেরা তাঁর সৈন্য হিসাবে যাবে। সেই ভ্রমর, মৌমাছি, মশা কুলের আক্রমণে ও দেবীর অস্ত্র প্রহারে অরুণাসুর বধ সম্পূর্ণ হয়। এরপর দেবতারা পুনরায় স্বর্গরাজ্যে প্রবেশ করেন।
অরুণাসুর বধের পর ভ্রমরগুলি পুনরায় দেবীর নিকট ফিরে আসে ও তাঁকে বেষ্টন করে রাখে। তিনিই দেবী মাতা ভ্রামরী কালিকা। সেই রূপেই তিনি পুজিতা হন।
প্রচলিত লৌকিক রীতি
মন্দিরটি দিবারাত্রি সর্বদাই খোলা থাকে। এখানে মায়ের নিকট পূজা প্রদানের ক্ষেত্রে পূর্বে নিকটবর্তী তিস্তা নদীতে স্নান করে ধৌত বস্ত্র পরিধান করার রীতি প্রচলিত আছে।
এই মন্দিরে পূণ্যার্থীগণের জন্য রাজ্য সরকার কিছু সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
প্রধান উৎসব :-
মন্দিরে নবরাত্রি ও দুর্গাপূজা সাড়ম্বরে পালিত হয়।
মাঘী পূর্নিমার পূণ্য তিথিতে বিশেষ পূজা ও মেলা অনুষ্ঠিত হয়।
কিভাবে যাবেন :-
1) বিমান পথ :-
নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কলকাতা এবং সেখান থেকে বাগডোগরা বিমান বন্দর। এরপর সড়ক পথে মন্দির পৌঁছান যাবে।
2)রেলপথ :-
ক)হাওড়া রেলস্টেশন 2) শিয়ালদা রেলস্টেশন। দুটি স্টেশনই ভারতের সমস্ত নগর,শহরের সাথে যুক্ত। সেখান থেকে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন ও তারপর সড়ক পথে বাস ও অন্যান্য যানবাহনে মন্দির আসা যাবে।
সড়কপথ ;-
ভরতবর্ষের যেকোন স্থান থেকে সড়কপথে মন্দির পর্যন্ত আসা যায়। জলপাইগুড়ি থেকে মায়ের মন্দির মাত্র 18 কিমি।
মায়ের মন্দিরটি বৈকুণ্ঠপুর অরন্য অঞ্চল অধীন শাল,সেগুন প্রভৃতি বৃক্ষবেষ্টিত এক মনোরম পরিবেশের মধ্যে অবস্থিত। তন্ত্রসাধনার এক উত্তম ক্ষেত্র হিসাবে গণ্য হয়।
দর্শনীয় স্থান :-
দেবী চৌধুরানী মন্দির, সেবক কালীবাড়ি, গজলডোবা সাফারি পার্ক, জলপাইগুড়ি ও দার্জিলিং জেলার নয়ন মনোহর বিস্তৃত চা-বাগান, জলদাপাড়া অভয়ারণ্য প্রভৃতি।
সুধী পাঠকবৃন্দ! এই ব্লগে যদি আপনারা কোনও বিশেষ শক্তিপীঠ সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হন, আমাদের জানান। আমরা লিখতে সচেষ্ট হবো। পাঠ করে আপনার অনুভূতি মন্তব্য করুন। ধন্যবাদ।