Shree Somnath Temple in Bengali.
Verval, Somnath Gir district,Gujarat, India
শ্রী সোমনাথ জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দির
বেরাবল, সোমনাথ গির জেলা, গুজরাট, ভারত।
(ভারতবর্ষে অবস্থিত সর্বাধিক পূজিত প্রথম জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দির)
ভারতবর্ষে অবস্থিত দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ শিব মন্দিরের মধ্যে সোমনাথ মন্দির প্রথম প্রকাশ বলে বিশ্বাস করা হয়ে থাকে। মন্দিরটি গুজরাটের সৌরাষ্ট্র এলাকায় পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত। স্থানটি গুজরাটের প্রভাস পত্তন বা দেব পত্তন বলে পরিচিত।
অরিদ্রা নক্ষত্রের রাত্রে মহাদেব স্বয়ং জ্যোতির্লিঙ্গ বা জ্যোতির্লিঙ্গম্ রূপে মর্ত্যধামে আবির্ভূত হয়েছিলেন। হিন্দু ধর্মে ঐ স্থানগুলি পবিত্রতম তীর্থক্ষেত্র হিসাবে পরিগণিত হয়।
সোমনাথ মন্দির সৃষ্টির আদি রহস্য ও চন্দ্র-কলার হ্রাস-বৃদ্ধির পৌরাণিক কাহিনী
প্রাচীনকালে চন্দ্রের সঙ্গে মহারাজ দক্ষের 27 টি কন্যার বিবাহ হয়। কালক্রমে চন্দ্রদেব তাদের মধ্যে শুধুমাত্র রোহিনীকেই ভালোবাসতে শুরু করেন। অন্য 26 জনকে অবহেলা করতেন।
ঐ স্ত্রীগণ পিতা দক্ষের নিকট চন্দ্রের বিরুদ্ধে নালিশ করেন। দক্ষ জামাতা চন্দ্রকে ক্ষয়িত হওয়ার অভিশাপ দেন। ফলে চন্দ্র প্রতিনিয়ত ক্ষয়িত হওয়া থেকে রক্ষা পেতে সমুদ্রতটে এই ত্রিবেণী সঙ্গমে স্নান করে মহাদেবের তপস্যা করেন।
এইস্থলে তিনটি নদী - কপিলা, হিরণ ও সরস্বতী, একত্রে এসে মিলিত হয়েছে। সেই তপস্যায়, মহাদেব সন্তুষ্ট হয়ে তাকে দক্ষের অভিশাপ থেকে আংশিক মুক্ত করে দেন।
চন্দ্রের তারপর থেকে ক্ষয়িত হওয়া ও তা পূর্ণ হওয়া শুরু হয়।
এটাই চন্দ্রকলার হ্রাস-বৃদ্ধির কারণ বলে পুরাণে বর্ণিত হয়েছে।
চন্দ্রদেব প্রভূ ব্রহ্মার আদেশে এই স্থানে একটি সোনার মন্দির তৈরী করে চন্দ্র অর্থাৎ সোমের নাথ তথা সোমনাথ মহাদেবের প্রতিষ্ঠা ও পূজা করেন। চন্দ্রের অপর নাম সোম ও তার যিনি ঈশ্বর অর্থাৎ সোমনাথ সেই মন্দিরে পূজিত হন।
কথিত আছে ভগবান কমলচরণ শ্রীবিষ্ণু স্বয়ং এই মন্দিরে মহাদেবের পূজা করেছিলেন।
মহাদেবের জ্যোতির্লিঙ্গরূপ ধারণ
পুরাকালে ব্রহ্মা ও বিষ্ণুদেবের মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ সেই নিয়ে বিবাদ হয়। তাঁরা উভয়েই দাবী করতে থাকেন তিনিই শ্রেষ্ঠ দেবতা। তাঁরা বিচারের জন্য মহাদেবের নিকট গমণ করেন ও কে বড় তা স্থির করে সিদ্ধান্ত জানাতে বলেন।
মহাদেব, মর্ত্য থেকে স্বর্গ অবধি একটি গর্ত তৈরী করেন। যা ছিল অনাদি-অনন্ত, আদি-অন্তহীন, তাঁর নিজেরই স্বরূপের প্রকাশ।
মহাদেব দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গরূপে বারোটি স্থানে প্রকটিত হন এবং সেই স্থানগুলিতে দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দির নির্মিত হয় ও সেগুলি তীর্থক্ষেত্ররূপে চিহ্নিত হয়।
কথিত আছে তিনি সেই গর্তের মধ্যে জ্যোতির্লিঙ্গ রূপে বিরাজমান হন। ব্রহ্মা ও বিষ্ণুকে সেই অনাদি-অনন্তরূপ জ্যোতির্লিঙ্গের আদি ও অন্ত খুঁজে দেখতে বলেন।
বিষ্ণু বরাহরূপে পাতালে প্রবেশ করেন ও ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসে সত্য কথা বলেন।
ব্রহ্মা পক্ষীরূপে লিঙ্গের ঊর্দ্ধদেশ সন্ধানে গমণ করেন। কিন্তু তিনি শ্রেষ্ঠ একথা প্রমাণ করতে ফিরে এসে মিথ্যা কথা বলেন যে তিনি ঊর্দ্ধদেশে পৌঁছেছেন ও তার প্রমাণস্বরূপ সেখান থেকে আনা একটি 'কেতকী' পুষ্প দেখান।
মহাদেব বোঝেন যে, ব্রহ্মা মিথ্যা বলছেন এবং ক্রোধান্বিত হয়ে ব্রহ্মার পঞ্চম-আনন ছেদন করেন। ব্রহ্মা 'চতুরানন' নামে আখ্যায়িত হন।
মহাদেব আরও অভিশাপ দেন যে দেবতা হিসেবে ব্রহ্মার ভবিষ্যতে কোন মন্দিরে পূজিত হওয়ার অধিকার থাকবে না।
তাই, মহাদেব ও বিষ্ণুর মন্দির রয়েছে, ফলে তাঁরা পূজা পান। কিন্তু ব্রহ্মার কোন মন্দির নাই ও তিনি পূজা পান না।
এছাড়া কেতকী পুষ্প মিথ্যা সাক্ষ্য দেবার অপরাধে দেবতার পূজায় ব্যবহৃত হওয়ার অধিকার থেকে মহাদেবের অভিশাপে আজও বঞ্চিত।
সোমনাথ মন্দিরের ধ্বংস ও পুনর্গঠন
ঐতিহাসিক অতীতে সোমনাথ মন্দিরটি বহুবার মুসলিম লুন্ঠনকারী, শাসক ও পর্তুগীজ আক্রমনের ফলে লুন্ঠিত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে এবং পুনর্গঠিত হয়েছে।
প্রাচীন মন্দিরটির ধ্বংস হওয়ার পর 649 খৃঃ বল্লভী রাজবংশের যাদব রাজারা সেটি পুনর্গঠন করেন।
সিন্ধু প্রদেশের আরব গভর্নর আল জুনায়েদ 725খৃঃ সম্ভবতঃ দ্বিতীয় মন্দিরটি ধ্বংস করেন।
গুর্জর-প্রতিহার বংশের রাজা 915 খৃঃ নাগাদ তৃতীয় মন্দিরটি পুনরায় নির্মান করেন। এই মন্দিরটি লাল পাথর দিয়ে গড়া একটি বিশাল আকৃতির ছিল।
997খৃঃ কিছু পূর্বে মূলরাজা নামে একজন চালুক্য (সোলাঙ্কি) রাজবংশের রাজা শ্রীসোমনাথের প্রথম মন্দিরটি তৈরী করেন। যদিও অনেক ঐতিহাসিকের মতে তিনি পুরাতন মন্দিরটি সংস্কার মাত্র করেন।
1024 খৃঃ গজনীর সুলতান মামুদ লুন্ঠনের উদ্দেশ্যে গুজরাট আক্রমন করে ও সোমনাথ মন্দিরে জ্যোতির্লিঙ্গটি ভেঙে ফেলে প্রচুর ধনরত্ন এবং মূল্যবান সামগ্রী লুঠ করে নিয়ে যান। কথিত আছে, মামুদ দ্বারা লুন্ঠিত ধনরত্নের মূল্য প্রায় 20 মিলিয়ন (1মিলিয়ন= 10 লক্ষ) দিনার (আরবি মুদ্রা)।
অনেকের মতে, কাঠের তৈরী মন্দিরটি কালজীর্ন হয়ে পড়েছিল এবং তার ফলে, খুব একটা ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
এরপর, 1169 সালের একটি প্রস্তরলিপি থেকে জানা যায় যে, কুমারপাল (1143-1172খৃঃ) নামে এক রাজা রত্নখচিত বিশাল শ্রীসোমনাথ মন্দিরটি নির্মান করেন।
1299 সালে আলাউদ্দিন খিলজীর সেনাপতি উলুঘ্ খানের নেতৃত্বাধীন সৈনদল ভাগেলা রাজা কর্ণকে পরাজিত করে ও সোমনাথ মন্দিরটিও ধ্বংস করে।
সৌরাষ্ট্রের চূড়াসম রাজা মহীপাল-1 মন্দিরটি পুনর্গঠিত করেন। তাঁর পুত্র খেঙ্গারা 1331খৃঃ থেকে 1351খৃঃ মধ্যে মহাদেব শ্রীসোমনাথের জ্যোতির্লিঙ্গটি সেই মন্দিরে পুনঃ প্রতিষ্ঠিত করেন।
দিল্লীর সুলতানের প্রতিনিধি গুজরাটের শেষ গভর্ণর জাফর খান, 1395 খৃঃ মন্দিরটি ধ্বংস করে লুঠপাট করেন।
গুজরাটের এক সুলতান মন্দিরটিকে অপবিত্র করেছিলেন বলে জানা যায়।
দিল্লীর মোঘল শাসনকাল
দিল্লীর সম্রাট আওরঙ্গজেব 1665খৃঃ থেকে তাঁর শাসনকালে বহু হিন্দু মন্দির ধ্বংস করেছিলেন বলে জানা যায়। তার মধ্যে, সোমনাথ মন্দিরটিও ধ্বংস করা হয়। 1702খৃঃ তিনি আদেশ দেন যে, যদি হিন্দুরা সেখানে নতুন মন্দির নির্মান করে পুনরায় পূজার্চনা শুরু করে তো সেখানে যেন মন্দিরকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হয়।
উত্তর ভারতে মারাঠা অভ্যুত্থান ও হিন্দু মন্দির পুনর্গঠন
উত্তর ভারতে মারাঠা জাতির উত্থান মুসলিম শাসনকালে এক তাৎপর্য বহন করে। মারাঠাগণ, মুসলিম লুঠেরা ও শাসকদের দ্বারা অনেক ধ্বংস প্রাপ্ত হিন্দু মন্দির সংস্কার ও পুনর্গঠন করেছিলেন।
ইন্দোরের মাধব রাও হোলকারের পুত্রবধূ অহিল্যাবাঈ হোলকার সোমনাথে একটি মহাদেব মন্দির নির্মাণ করেন। এছাড়া, কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের সংস্কার কার্যেও তাঁর প্রভূত অবদান রয়েছে।
মহাদাজী শিন্ধে লুঠ করে নিয়ে যাওয়া রৌপ্যনির্মিত দরজা গজনী থেকে পুনরুদ্ধার করে নিয়ে আসেন। তিনি সেই দরজাটি উজ্জয়িনীর শ্রীগোপালজীর মন্দিরে স্থাপন করেন।
ইংরেজ শাসনকাল ও হিন্দু মন্দির
1842 খৃঃ এডিনবরার প্রথম আর্ল এক ঘোষণার দ্বারা আফগানিস্থানে যুদ্ধরত ইংরেজ সৈন্যদলকে ফেরার পথে গজনীর উপর দিয়ে আসার নির্দেশ দেন। সৈন্যদলকে গজনীর মাহমুদের কবরে স্থাপিত ভারত থেকে লুঠ করে নিয়ে যাওয়া চন্দনকাষ্ঠ নির্মিত দরজাটি ফিরিয়ে আনার আদেশ দেন।
কথিত আছে, ঐ দরজাটি শ্রীসোমনাথ মন্দির থেকে মাহমুদ কর্তৃক লুন্ঠিত হয়েছিল।
সেনাপতি জেনারেল উইলিয়াম নট 1842খৃঃ দরজাগুলি ভারতে ফিরিয়ে আনেন।
স্বাধীনতা পরবর্তী কাল ও সোমনাথ মন্দির পুনর্গঠন
স্বধীনতা উত্তর ভারতবর্ষে সোমনাথ মন্দিরের পুননির্মান সরকারীভাবে অনুমোদিত ও গঠিত হয়।
1947 সালে স্বাধীনতার প্রথমে ভারত পুনর্গঠন পর্বে জুনাগড় রাজ্যের শাসনকর্তা পাকিস্তানে সংগে সংযুক্তির সিদ্ধান্ত প্রকাশ করেন। কিন্তু ভারত সরকার তা প্রত্যাখ্যান করলে রাজ্যটি ভারতের অন্তর্ভূক্ত হয়।
1947 সালের 12 ই নভেম্বর এই রাজ্য পরিদর্শন করেন, ভারতবর্ষের প্রথম ডেপুটি প্রাইম মিনিস্টার সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল ও জুনাগড়ে সুস্থিতি স্থাপনের জন্য, সেনাবাহিনীকে আদেশ দেন।
এছাড়া, ঐসংগে তিনি শ্রীসোমনাথ মন্দিরটিও সুপুনর্নির্মানের আদশ দেন।
ভারতের মন্ত্রীসভার এক প্রতিনিধি দল মহাত্মা গান্ধীর অনুমতি গ্রহণ করতে যান। তিনি তা অনুমোদন করে বলেন যে, গুজরাট সরকারের অর্থে নয়, তা যেন জনগণের প্রদত্ত দানে গঠিত হয়।
অদূরবর্তীকালে, মহাত্মা ও সর্দার প্যাটেল উভয়েই মারা যান। পুনর্গঠন প্রক্রিয়া ফুড অ্যান্ভ সাপ্লায়েজ মন্ত্রী কে এম মুন্সীর তত্বাবধানে সম্পন্ন হয়।
1950 সালে মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে ফেলে নতুন মন্দির নির্মান করা হয়।
সেইস্থানে অবস্থিত মসজিদটিকে কয়েক কিমি দূরে, নির্মান যন্ত্রপাতির সাহায্যে সরিয়ে দেওয়া হয়।
11ই মে 1951 ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি ডাঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ মন্দিরটি উদ্বোধন করেন ও তাঁর উপস্থিতিতে দেবতার প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়।
উদ্বোধনী ভাষণে তিনি বলেন, "The Somnath Temple signifies that the power of reconstruction is always greater than the power of demolition."
যার বাংলা করলে দাঁড়ায়, সোমনাথ মন্দির প্রমাণ করল যে, গঠনের শক্তি ধ্বংসের শক্তি অপেক্ষা অধিকতর শক্তিশালী।
মন্দিরের স্হাপত্যকলা
বর্তমান মন্দিরটি চালুক্য ঐতিহ্য অনুসারে 'কৈলাশ মহামেরু প্রাসাদ' স্থাপত্য শিল্পকলা রীতিতে পুনর্গঠিত হয়। গুজরাটের স্বনামধন্য শ্রেষ্ঠ স্থাপত্যশিল্পী সোমপুরা স্যালাটের সুদক্ষ নিপুনতায় মন্দিরটি গঠিত হয়।
মন্দিরের প্রধান চূড়াটি 15মিটার উচ্চ ও 8.2মি. লম্বা একটি নিশান দণ্ড সর্বোচ্চ শিখরে বিরাজমান।
মন্দির খোলা ও বন্ধের সময়সূচী
সকাল 6টা থেকে রাত্রি 10টা পর্যন্ত ( বিশেষ উৎসবের ক্ষেত্রে পরিবর্তন সাপেক্ষ)
বিশেষ উৎসবসমূহ :-
মহাশিবরাত্রি, শ্রাবণ ও কার্তিক মাসের সোমবার সমূহ।
কি ভাবে যাবেন :-
বিমানে :- নিকটবর্তী বিমান বন্দর দিউ। দূরত্ব 81কিমি। ভাড়ার গাড়ি পাওয়া যাবে।
রেলপথে :- নিকটবর্তী রেলস্টেশন বেরাবল। মন্দির থেকে দূরত্ব 6কিমি।
সড়কপথে :- গুজরাটের যে কোন প্রান্ত থেকে মন্দির অবধি বাস যোগাযোগ রয়েছে। রাস্তা-ঘাট খুবই উন্নত মানের।
নিকটবর্তী দর্শনীয় স্থানসমূহ :-
1) সূরয মন্দির 2) লক্ষ্মী-নারায়ণ মন্দির, 3) দেহোৎসর্গ তীর্থ, 4) ভালকা তীর্থ, 5) পঞ্চ-পাণ্ডব গুফা(গুফা মন্দির), 6) শ্রীপরশুরাম মন্দির, 7) ঐতিহাসিকভাবে আকর্ষণীয় জুনাগড় দরজা, 8) গীতা মন্দির, 9) ত্রিবেনী ঘাট, 10) সোমনাথ সমূদ্র সৈকত, 11) গির জাতীয় পার্ক,12) বিপদভঞ্জন মন্দির। এছাড়াও আরও অনেক।