Temple of Mata Aparna Shaktipeetha
Bivag: Rajshahi, District: Bagura Sherpur, Bangladesh.
মাতা অপর্না শক্তিপীঠ
বিভাগঃ রাজসাহী, জেলাঃ বগুড়া
শেরপুর, বাংলাদেশ।
পুরাণ কথা ও শক্তিপীঠ সৃষ্টি
'তন্ত্রচূড়ামণি' গ্রন্থ মতে এই শক্তিপীঠ সম্পর্কে বলা হয়েছে ---
"করতোয়া তটে কর্ণে
বামে বামন ভৈরবঃ
অপর্ণা দেবতা যত্রঃ
ব্রহ্মরূপাকরুদ্রবঃ।"
বর্তমান বাংলাদেশের রাজসাহী বিভাগের অধীন বগুড়া জেলার শেরপুরে করতোয়া নদীতটে প্রতিষ্ঠিত দেবী সতীর 51 শক্তিপীঠের মধ্যে অন্যতম শক্তিপীঠ ভবানীপুর অবস্থিত।
মূল মন্দিরের শ্বেতবর্ণ কষ্টি পাথরে তৈরী দেবীর ত্রিভূজ সদা প্রসন্না দৃষ্টি করুণাময়ী মাতৃমূর্তি মন্দিরে সমাগত ভক্তজনের হৃদয়ে ভক্তিভাব বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
কথিত আছে, বিভিন্ন মতে, এখানে দেবী সতীর বাম বাহুর অলংকার বা বাম পঞ্জর বা দক্ষিণ চক্ষু বা শয্যাদ্রব্য পতিত হয়েছিল।
এখানে দেবী অপর্ণা মাতৃস্বরূপা করুণাময়ী এবং এই স্থানে মায়ের অভিভাবক ও রক্ষক রূপে কালভৈরব 'বামন' অধিষ্ঠিত ও নিত্য পূজিত হন।
এছাড়া, মন্দির প্রাঙ্গনের বহির্ভাগে অপূর্ব শ্বেতপাথরের, বেলবরণ তলা, বাসুদেব মন্দির, গোপালরূপে বালক শ্রীকৃষ্ণের মন্দির, পাতাল ভৈরব মন্দির,নাট মন্দির(আটচালা)ও একটি পঞ্চমুণ্ডী আসন রয়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, কথিত আছে,সেন রাজবংশের কোন এক রাজা সন্ন্যাস গ্রহণ করে ঐ আসনে বসে সাধনা করেছিলেন।
পুরাণ কাহিনী
সত্যযুগে প্রজাপতি ব্রহ্মার পুত্র দক্ষের কন্যা সতী দেবী রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করে, গভীর অরণ্যে দেবাদিদেব মহাদেকে স্বামীরূপে পাবার জন্য কঠোর তপস্যা করেন। মহাদেব সন্তুষ্ট হয়ে তাঁর প্রার্থনা পূর্ণ করেন। এই বিবাহে পিতা দক্ষ অত্যন্ত রুষ্ট হন।
প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য মহারাজ দক্ষ তাঁর প্রাসাদে এক শিবহীন যজ্ঞের আয়োজন করেন। সেখানে তাঁর সকল কন্যা-জামাতারা আমন্ত্রিত হলেও, শিব ও সতীকে আমন্রন করা হয় নি।
মহর্ষি নারদের মুখে সতী সে সংবাদ পান ও পিতৃগৃহে যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন এবং শিবের বিনা অনুমতিতে সতীদেবী, নন্দীকে নিয়ে পিত্রালয়ে গমন করেন।
মহারাজ দক্ষ সতীকে সামনে পেয়ে শিবনিন্দা শুরু করেন। সতী স্বামী নিন্দা সহ্য করতে না পেরে যজ্ঞস্থলে প্রজ্জ্বলিত যজ্ঞাগ্নিতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মবিসর্জন করেন।
অনুচর নন্দীর মুখে সে সংবাদ পেয়ে ক্রোধাণ্বিত শিব তৎক্ষনাৎ সেখানে উপস্থিত হয়ে, তাঁর একগাছি জটা ছিন্ন করে নিজের অংশ থেকে কালভৈরবরূপে বীরভদ্রের সৃষ্টি করে দক্ষের ছাগমুণ্ড ছেদন করেন।
এরপর, শোকাচ্ছন্ন মহাদেব সতীদেবীর দগ্ধ মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে তাণ্ডবনৃত্য করতে করতে ভূমণ্ডলে ভ্রমণ শুরু করেন।
শিবকে শান্ত করতে ও সৃষ্টিরক্ষা করতে ভগবান শ্রীবিষ্ণু তাঁর ' সুদর্শন চক্র' দিয়ে দেবী সতীর দেহ 51টি খণ্ড করেন।
হিন্দু পুরাণ মতে দেবী সতীর দেহ খণ্ডগুলি যে সমস্ত স্থানে পতিত হয়েছিল, সেখানে দেবীর পরা-শক্তি বিরাজমান থাকে। সেই সমস্ত স্থানগুলিকে বলা হয় 'শক্তিপীঠ'। এই স্থানগুলিতে, হিন্দু ধর্মাবলম্বী শাক্ত, শৈব, বৈষ্ণব সকল মতে বিশ্বাসী ভক্তগণ পূজা-পাঠ ও দেবীর নিকট মোক্ষ কামনায় সাধকগণ তন্ত্রমতে আচার অনুযায়ী সাধনা করে থাকেন।
শঙ্খ পুষ্করিণী বা শাঁখা পুকুর
মাতা ভবানী মন্দিরের উত্তর প্রান্তে অবস্থিত 'শঙ্খ পুষ্করিণী' বা শাঁখা পুকুর। এই পুষ্করিণীতে স্নান করলে পূণ্য অর্জিত হয় বলে ভক্তগণ বিশ্বাস করেন।
এই পুকুর সম্বন্ধে এক কিম্বদন্তী প্রচলিত আছে। নাটোরে তখন রানী ভবানীর রাজত্বকাল। সেই সময় একদিন এক শঙ্খ-বলয় বিক্রেতা এই পুকুরের ধারে জলপান ও খানিক বিশ্রাম করছিলেন। সেই সময় এক নবম বর্ষীয়া সিঁথিতে সিন্দুর পরা বালিকা এসে তাকে এক জোড়া শাঁখা পরিয়ে দিতে বলে। শাঁখা পরার পর সে বলে যে সে রাজবাড়ির পুরোহিতের কন্যা । সেখানে গিয়ে তার বাবাকে যেন বলে যে মন্দিরের এক গোপন কুঠুরিতে কাঠের বাক্সে পয়সা রাখা আছে, তার থেকে যেন শাঁখার দাম দিয়ে দেয়।
শাঁখা বিক্রেতা রাজবাড়িতে গিয়ে সব কথা পুরোহিতকে বলে। সেই অনুযায়ী অজানা সেই কুঠুরিতে কাঠের বাক্সের মধ্যে রাখা পয়সা পাওয়া যায়। আশ্চর্য্য, এই কুঠুরির কথা আগে কেউ জানতোই না।
সেকথা রাণীমার কানে যায় ও তিনি সঙ্গে সঙ্গে সপারিষদ শাঁখারিকে নিয়ে গিয়ে স্থানটিতে পৌঁছে দেখেন কেউ নেই। তিনি সন্দেহ প্রকাশ করলে পুষ্করিণীর মাঝখান থেকে দুটি শাঁখা-পরা হাত দেখা যায়। সবাই মা ভবানীর উদ্দেশ্যে প্রণাম জানায়।
বর্তমানে শাঁখা পুকুরে দুটি স্নান ঘাট রয়েছে।
পূজা ও পার্বন
মন্দিরে নিত্যপূজা-পাঠ প্রচলিত নিয়ম অনুসরণ করা হয়ে থাকে।
প্রভাতে, প্রভাতী বাল্যভোগ, দ্বিপ্রহরে, পূজা-পাঠ ও মধ্যাহ্নের অন্নভোগ, সন্ধ্যায়, পূজা, আরতি ও রাত্রিকালীন ভোগ মাকে অর্পন করা হয়।
এছাড়া, মন্দিরে আগত ভক্তজন প্রদত্ত মিষ্টান্নভোগ ও অন্যান্য উপাচার এবং ভক্তদের অর্থে আয়োজিত অন্নভোগও মাকে নিবেদন করা হয়। মন্দিরে আগত ভক্তবৃন্দ পরে ভোগ প্রসাদ পেয়ে থাকেন।
উৎসবসমূহ
প্রতি বৎসর মাঘ-ফাল্গুন মাসে 'মাঘী পূর্ণিমা, চৈত্র-বৈশাখ মাসে রামনবমী, আশ্বিন-কার্তিক মাসে শারদীয়া দুর্গাপূজা, কার্তিক মাসে দীপান্বিতা শ্যামাপূজা এবং অগ্রহায়ণ মাসে নবান্ন উৎসব পালিত হয়। মন্দিরে অনুষ্ঠিত প্রতিটি পূজা ও উৎসব নিয়মবিধি ও তিথি অনুসারে নিষ্ঠার সঙ্গে পালিত হয়ে থাকে।
মন্দির 24ঘণ্টা খোলা থাকে।
মন্দিরে কোন প্রবেশ মূল্য নাই।
মন্দির কমিটি
ভবানীপুর শক্তিপীঠের মন্দির কমিটি মন্দিরের সংস্কার, নবীকরণ, ও যথাযথ রক্ষনাবেক্ষন, যাত্রী স্বাচ্ছন্দ্য প্রভৃতি সবিশেষ বিষয় যত্নসহকারে পরিচালনা করছেন। অতিথি নিবাসটি পুনর্নির্মান করা হয়েছে ও যাত্রী সাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে।
যাতায়াত ব্যবস্থা
বাংলাদশের প্রধান বিমান বন্দর;-
হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর যার পূর্ব নাম জিয়া আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর।
এটি রাজধানী ঢাকার কুর্মিটোলায় অবস্থিত এবং প্রধান বিমান বন্দর।
ঢাকা থেকে যমুনা নদী পার হয়ে, সিরাজগঞ্জ জেলার চন্দাইকণা ভায়া রাস্তায় ঘোগা বটতলা বাসস্ট্যান্ড। সেখান থেকে ভ্যান রিক্সা বা স্কুটার গাড়িতে করে মন্দিরে পৌঁছে যাওয়া যায়।
তাছাড়া, বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বাস(এসি/নন্ এসি) অথবা গাড়ীতে করে মন্দিরে আসা যায়।
সুধী পাঠকবৃন্দ! আশা করি লেখাটি আপনাদের ভালো লেগেছে। আপনাদের মূল্যবান মন্তব্য ও গঠনমূলক মতামত আমাদের অনুপ্রাণিত করবে। পরিচিতজনকে শেয়ার করার অনুরোধ জানাই। ধন্যবাদ।