Devi Bahula Shaktipeetha - Esso Pori- Read Now

Latest

মঙ্গলবার, ২৯ জুন, ২০২১

Devi Bahula Shaktipeetha

 

Devi Bahula Shakti Peetha


Devi Bahula Shakti Peetha


বাহুলা শক্তিপীঠ কেতুগ্রাম, পূর্ব বর্ধমান পশ্চিম বঙ্গ, ভারত।


                        পুরাণ কাহিনী

  প্রজাপতি দক্ষরাজ তাঁর কন্যা সতীর স্বেচ্ছায় চাল-চূলাহীন মহাদেবকে বিবাহ করা কিছুতেই মেনে নিতে পারেন নি। সেই ক্রোধে, প্রতিশোধ গ্রহণ করতে, তিনি এক শিবহীন যজ্ঞের আয়োজন করেন। অন্যান্য কন্যা-জামাতাদের আমন্ত্রন জানালেও, শিব ও সতীকে তালিকা থেকে বাদ দেন। 

  সতী নারদের মুখে সংবাদ পেয়ে মহাদেবের নিষেধ সত্ত্বেও বিনা নিমন্ত্রনে পিতৃগৃহে উপস্থিত হন।  

  মহারাজ দক্ষ সতীকে সামনে পেয়ে শিবনিন্দা শুরু করেন। পতিনিন্দা সহ্য করতে না পেরে, সতীদেবী সেখানেই প্রজ্জ্বলিত যজ্ঞাগ্নিতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। 

  মহাদেব সেই দুঃসংবাদ পেয়ে ক্রোধান্বিত হয়ে নিজ জটা থেকে কালভৈরব বীরভদ্রকে সৃষ্টি করেন ও দক্ষকে হত্যার আদেশ দেন। 

  তাণ্ডবনৃত্যরত শিব সতীদেবীর মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে ভূমণ্ডলে বিচরণকালে জীবজগতের রক্ষা ও শিবকে শান্ত করতে ভগবান বিষ্ণু তাঁর সুদর্শন চক্র দিয়ে সতীর দেহ 51 টি খণ্ড করেন। সেগুলি যেসব স্থানে পতিত হয় সেখানে দেবী সতী শক্তিরূপে ও মহাদেব দেবীর অভিভাবক ও রক্ষকরূপে বিরাজ করেন। সেগুলিকে শক্তিপীঠ রূপে হিন্দুধর্মে গণ্য করা হয়। তন্ত্র মতে শক্তিপীঠগুলিতে দেবীর পরাশক্তি বিরাজ করে ও তন্ত্র সাধনার উপযুক্ত ক্ষেত্র হিসাবে বিবেচিত হয়ে থাকে।


                         দেবী বাহুলা

 "বহুলায়াং বামবাহু 

                    বহুলখ্যা চ দেবতা।           

 ভীরুকঃ ভৈরবস্ত্রত্রঃ

                      সর্বসিদ্ধিপ্রদায়কঃ।।"

  কবি রায়গুণাকর ভরতচন্দ্র রায় 'অন্নদা মঙ্গল' কাব্যে লিখেছেন,

  "বহুলায় বামবাহু ফেলিল কেশব।

  বাহুলা চণ্ডীকা তায় ভীরুক ভৈরব।।"


    51টি শক্তিপীঠের মধ্যে অন্যতম একটি হলো দেবী বাহুলা শক্তিপীঠ। এক গ্রাম্য শান্ত ও নিরিবিলি পরিবেশ ঘেরা মন্দিরে সমাগত সাধক ও পূণ্যার্থীগণ সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মানসিক পরিস্থিতি অনুভব করেন। 

  কথিত আছে, মা বাহুলার কাছে ভক্তজন যা প্রার্থনা করেন, তাঁদের সেই মনস্কামনা বিফলে যায় না। করুনাময়ী দেবী কোন পূণ্যার্থীকে অপূর্ণ বাসনা নিয়ে ফিরিয়ে দেন না। তিনি সবার বাসনাই পূর্ণ করেন।

  অজয় নদের তীরে পশ্চিম বর্ধমান জেলার এক শান্ত সবুজ পরিবেশে এই শক্তিপীঠের অবস্থান।দেবীর মন্দির এক অপূর্ব স্থাপত্য নিদর্শনে গঠিত। 

  মন্দিরের গর্ভগৃহে দেবী তাঁর দুই পুত্র কার্তিক ও গনেশের সাথে বিরজমানা। দেব সেনাপতি কার্তিক শৌর্য ও বীরত্বের প্রতীক। তিনি সন্তান প্রার্থী মহিলা ভক্তদের মনস্কামনা পূর্ণ করেন। সর্বসিদ্ধিদাতা প্রভূ গনেশ সর্বার্থসিদ্ধিদায়ক। তাঁর করুণায় ভক্তের জীবনে সাফল্য আসে। এই মন্দিরের অষ্টভূজ গণেশের মূর্তি মনোরম সুষমামণ্ডিত।


                      শক্তিপীঠ

  কথিত আছে, এখানে দেবীর বাম বাহু পতিত হয়েছিল। তাই এই দেবীশক্তির নাম বাহুলা। দেবীর    অভিভাবক ও রক্ষাকর্তা মহাদেব   "ভীরুক" নামে পূজিত। তিনি 'সর্বার্থ সিদ্ধিদায়ক' বা 'সর্বসিদ্ধিদায়ক'।

  দেবী এক অপার্থিব পরাশক্তির আধাররূপে স্বমহিমায় বিরাজিতা। যে সমস্ত শাক্তসাধক তন্ত্রমতে সাধনা করেন, তাঁরা এই শক্তিপীঠকে এক আদর্শ স্থান হিসাবে বিবেচনা করেন।

  


                      কবি চণ্ডীদাস

               জন্মঃ 1370    মৃত্যুঃ 1433

                  (এক্ষেত্রে ভিন্নমত আছে)

         

  মধ্যযুগে পঞ্চদশ থেকে সপ্তদশ শতকের সমৃদ্ধ বাংলাসাহিত্যে বৈষ্ণব পদাবলীসমূহ মূলতঃ শ্রীকৃষ্ণ ও রাধিকার ঐশ্বরিক প্রেমলীলা বিষয়ক রচনার এক বিশেষ স্থান রয়েছে।

  কবি চণ্ডীদাস প্রথম বাংলা বৈষ্ণব পদকর্তা হিসাবে বিবেচিত হন। তিনি  বাহুলা দেবীর পূজক হিসাবে অবস্থানকালে এক অন্ত্যজ বালবিধবা রমনীর প্রেমে আসক্ত হন ও তাকে বিবাহ করেন। ফলে তাঁকে সেইস্থান থেকে বিতাড়িত হতে হয়। তিনি সেই স্থান ত্যাগ করে বীরভূম জেলার নানুর গ্রামে গিয়ে বসবাস শুরু করেন। কথিত আছে, সেসময় তিনি প্রত্যহ যাঁর পূজার্চনা করতেন, সেই দেবী বিশালাক্ষীর মুর্তিটিও সঙ্গে নিয়ে যান। পরে সেই জনরোষ প্রশমিত হলে,তিনি ফিরে আসেন ও সেই পদে পূনর্বহাল হয়েছিলেন বলে কথিত আছে। এখানে আজও স্থানীয় জনগণ একটি অনুচ্চ ঢিবিকে "চণ্ডীভিটা" অর্থাৎ কবি চণ্ডীদাসের বাসস্থান বলে বিশ্বাস করেন।


                      পূজা ও উৎসবসমূহ

  এই মন্দিরে প্রতি বছর আশ্বিন মাসে দুর্গা পূজা, কার্তিকমাসে কালী পূজা, ফাল্গুন-চৈত্র মাসে জগদ্ধাত্রী পূজা ও নবরাত্রি উৎসব এবং শিবরাত্রিতে দুবার মেলা বসে। এই সময় বহু দূর-দূরান্ত থেকে জনসমাগম হয়। শিবরাত্রির সময় ভক্তজন উপবাস থেকে মহাদেবের পূজার জন্য মালা, ফুল,বেলপাতা, দুধ, ডাব, মধূ, গব্যঘৃত, ধাতু নির্মিত উপবীত প্রভৃতি উপচারে পূজার্ঘ্য দিয়ে থাকেন।

  মা বাহুলাকে অনেক ভক্ত শাড়ী ও স্বর্ণ, রৌপ্য প্রভৃতির অলংকারও দিয়ে থাকেন।

  মন্দির সকাল 6 টায় খোলা হয় ও  

রাত্রি 10 টায় বন্ধ হয়।

  কোন প্রবেশ মূল্য নাই।

  ছবি তোলা অবাধ।

  নিকটবর্তী শহর কাটোয়া।


         বর্ধমান জেলার দর্শনীয় স্থান

  বর্ধমান জেলার মূল বৈশিষ্ট্য কৃষিজ ফসল। সেজন্য এই জেলাকে "পশ্চিম বঙ্গের ধানের গোলা" বলা হয়। এছাড়া, বর্ধমান জেলার পশ্চিম অংশ শিল্প সমৃদ্ধ, যেখানে দুর্গাপুর একটি "স্টীল সিটি" অর্থাৎ ইস্পাত নগরী ও আসানসোল "কোল সিটি" বা কয়লা নগরী হিসাবে বিখ্যাত।

   বর্তমানে, জেলাটিকে পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান রূপে দুটি জেলা করা হয়েছে।

  বর্ধমান জেলা জুড়ে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান রয়েছে। তার মধ্যে, মাইথন ড্যাম, মেঘনাদ সাহা প্ল্যানেটোরিয়াম, কৃষ্ণসায়র ইকোলজিক্যাল পার্ক, গঙ্গার ধারা পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট কালনার "চুপী চর" এক প্রাকৃতিক পক্ষীনিবাস, যেখানে শীতকালে বিভিন্ন বিদেশী পক্ষীকূল ভিড় জমায়। 

  এগুলি ছাড়াও এই দুই জেলায় আরও অনেক দর্শনীয় স্থান ও মন্দির রয়েছে।


      বাহুলা দেবী শক্তিপীঠে কিভাবে যাবেন :-

  বিমান পথ :- নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর। সেখান থেকে দূরত্ব 159কিমি।

  রেলপথ :- হাওড়া ও শিয়ালদা রেল স্টেশন থেকে বর্ধমান রেল স্টেশন এবং সেখান থেকে কাটোয়া জংশন স্টেশন। সেখান থেকে দূরত্ব 16 কিমি। 

  সড়ক পথ :- বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে ভারতের অন্যান্য রাজ্যের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই উন্নত মানের হয়েছে এবং বাস ও অন্যান্য যানবাহনে সহজেই এখানে আসা যায়। কেতুগ্রাম বাস স্ট্যান্ড থেকে মন্দিরের দূরত্ব মাত্র 500 মিটার।


  সুধী পাঠক বন্ধুগণ, বর্ধমান জেলার বাহুলা দেবীর মন্দির, একটি শক্তিপীঠ সম্বন্ধে আমরা কিছু তথ্য তুলে ধরেছি। এছাড়া, এসম্পর্কে আর ও কিছু জানার জন্য আমাদের ব্লগে যোগাযোগ করুন ও পরবর্তী লেখার জন্য এখানে লক্ষ্য রাখুন ও মন্তব্য করুন। ধন্যবাদ।