Karnagarh temple in Bengali
A most revered pilgrim place Karnagarh Temple
Karnagarh, Shalboni CD Block
Paschim Medinipur, West Bengal, India.
মা মহামায়া মন্দির, কর্ণগড়
(পূণ্যার্থীদের ভ্রমণযোগ্য একটি প্রাচীন মন্দির)
কর্ণগড়, শালবনী সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক,
পশ্চিম মেদিনীপুর, পশ্চিম বঙ্গ, ভারত।
মন্দির শহর কর্ণগড় ও চূয়াড় বিদ্রোহ
কয়েক শতাব্দী প্রাচীন এক জমিদার বংশের প্রতিষ্ঠিত দেবী মা মহামায়ার মন্দির ও তৎ সংলগ্ন গড়ের ঐতিহ্যমণ্ডিত অবস্থিতির বর্তমান ধ্বংসাবশেষ। কয়েক শতাব্দী প্রাচীন দেবী মন্দির ও তার সাথে সংযুক্ত ব্রিটিশ সরকার বিরোধী ঐতিহাসিক আন্দোলনের পটভূমিতে গৌরবাণ্বিত এক শহর, কর্ণগড়।
কর্ণগড়ের জমিদার বংশের প্রতিষ্ঠিতা এবং পূজিতা দেবী মহামায়ার মন্দির ও গড়ের দুর্গের অবস্থিতি সে যুগের ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।
ইতিহাস অনুসারে "চূয়াড় বিদ্রোহ" চলা কালীন স্থানীয় রাজা তথা জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় বিদ্রোহীরা মা মহামায়ার মন্দিরে ও দুর্গ প্রাকারের ভিতর আশ্রয় নিয়ে ব্রিটিশ শাসকের উৎপীড়নের হাত থেকে আত্মরক্ষা করত।
সেই বিদ্রোহ দমন করতে ইংলণ্ডের প্রভূদেরও বেশ বেগ পেতে হয়েছিল।
সেযুগে স্থানীয় জমিদারগন নিজেরা রাজা উপাধি ব্যবহার করতেন। কর্ণগড়ে সিং বংশের রাজাগণ শাসন করতেন।
সুপ্রতিষ্ঠিত লেখক বিনয়কৃষ্ণ ঘোষের লেখা থেকে জানা যায় যে, কর্ণগড়ের জমিদারী আশেপাশের অঞ্চল এমন কি মেদিনীপুরও অন্তর্ভূক্ত ছিল।
এই রাজবংশের কয়েকজন জমিদারের বংশতালিকা :-
1) রাজা লক্ষ্মণ সিং-1658-1661
2) রাজা শ্যাম সিং - 1661-1668
3) রাজা ছোট্টু রায় - 1668 - 1671
4) রাজা রঘুনাথ রায় - 1671- 1693
5) রাজা রাম সিং - 1693-1711
6) রাজা যশোবন্ত সিং - 1711-1749
7) রাজা অজিত সিং - 1749 (মৃত)
রাজা অজিত সিং-এর অকাল মৃত্যুর পর চূয়াড় বিদ্রোহীগণ ঐ কর্ণগড় রাজপ্রাসাদ ও জমিদারী সম্পত্তি অধিকার করে। রাজা অজিত সিংএর দুই পত্নী তাঁদের পরম আত্মীয় নাড়াজোলের খাঁ রাজবংশের সেই সময়ের জমিদার রাজা ত্রিলোচন খাঁ তাঁদের রাজবাড়িতে আশ্রয় প্রদান করেন। জ্যেষ্ঠাপত্নী রানী ভবানী 1754খ্রীঃ (বাংলা 1161) মারা যান। পরে, 1756 খ্রীঃ চূয়াড় বিদোহীদের হাত থেকে নাড়াজোল রাজবংশের সহায়তায় জমিদারী পুনরায় উদ্ধার করা হয় ও কনিষ্ঠা পত্নী রানী শিরোমনী সম্পূর্ণ জমিদারীর শাসন ক্ষমতা ফিরে পান। তিনি 1758-1812 খ্রীঃ পর্যন্ত শাসন করেন। এক্ষেত্রে নাড়াজোলের রাজা আন্ন্দলাল খাঁ তাঁকে সহায়তা দান করেন।
বিভিন্ন লেখা থেকে জানা যায় যে, পরবর্তীকালে, দুর্ভিক্ষ, ব্রিটিশ শাসকদের অতিরিক্ত উচ্চহারে কর আরোপ, কর আদায়ে দুস্থ প্রাজাদের উপর চরম শারীরিক অত্যাচার প্রভৃতি আরো অনেক কারণে "চূয়াড় বিদ্রোহ এক ঐতিহাসিক বিদ্রোহের রূপ নেয়। অবিভক্ত মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, পুরুলিয়াসহ পূর্ব বিহারের (যা এখন ঝাড়খণ্ড রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত) সমগ্র জঙ্গল মহল ব্রিটিশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। চূয়াড় বিদ্রোহে স্থানীয় আদিবাসীগণ অংশ গ্রহন করেছিল। সেই বিদ্রোহে গোবর্ধন দীপকাটি নামে একজন আদিবাসী নেতৃত্ব প্রদান করছিল।
এই বিদ্রোহের সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহে রানী শিরোমনী কে ব্রিটিশ শাসকরা অন্তরীন বন্দী হিসাবে তাঁর মেদিনীপুর শহর সংলগ্ন আবাস রাজবাড়িতে আটকে রাখে। যাই ঘটে থাকুক, এটা সত্য বলে মেনে নিতে হবে যে রানী শিরোমণীর সংগে বিদ্রোহীদের গভীর যোগাযোগ ছিল।ইংরেজ শাসকরা তাঁর উপর মানসিক শারীরিক নির্যাতন চালায়। তার ফলে, তিনি 1812খ্রীঃ (বাংলা 1219 বঙ্গাব্দ) মারা যান।
ভারতবর্ষের সিপাহী বিদ্রোহের বহু পূর্বে প্রথম সশস্ত্র স্বাধীনতা আন্দোলনের পথিকৃত হিসাবে চূয়াড় বিদ্রোহ অবশ্য পরিগণিত হবে। অবশ্য অনেকেই এই প্রথম ব্রিটিশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকে "চূয়াড় বিদ্রোহ" নামে স্বীকার করতে রাজী নয়। তাঁরা এই বিদ্রোহকে শোষিত প্রজাদের প্রথম স্বাধীনতা আন্দোলন নামে চিহ্নিত করেন। আজ সেই পটভূমিতে রানী শিরোমণীর নাম ব্রিটিশের বিরুদ্ধে প্রথম স্বাধীনতা আন্দোলনের শহীদ হিসাবে চির ভাস্বর হয়ে থাকবে।
মা মহামায়া মন্দির, কর্ণগড়
প্রাচীন লেখা থেকে জানা যায় যে এখানে প্রতিষ্ঠিত মন্দিরগুলির গঠনশৈলী প্রধানত উড়িষ্যার স্থাপত্যরীতির অনুসারী।
প্রচলিত প্রবাদ অনুসারে স্থানীয় অধিবাসীদের বিশ্বাস যে,মহাভারতের যুগে এই স্থান মহারাজ কর্ণের অঙ্গ রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত ছিল। মহারাজ কর্ণের গড় বা দুর্গ অনুসারে এই স্থানের নাম হয়েছে কর্ণগড়। তবে এই প্রবাদের কোন ঐতিহাসিক ভিত্তি নাই।
অপর এক মতানুসারে উড়িষ্যার রাজা কর্ণ কেশরীর নামানুসারে এই স্থানের নাম হয়েছে কর্ণগড়।
এখানে যে মন্দির সমূহ দেখা যায় এখনও অটুট তার মধ্যে দুটি মন্দির রাজা মহাদেব সিং এর স্মৃতিতে তৈরী হয়েছিল। তাছাড়া, দুর্গ, বিভিন্ন মন্দির ও দুর্গ-প্রাচীরের ধ্বংসাবশেষ দেখে বোঝা যায় যে দুর্গটি প্রায় 3কিমি স্থান জুড়ে অবস্থিত ছিল এবং আজ তা সংস্কার অযোগ্য হয়ে গিয়েছে।
কর্ণগড়ের পশ্চিম অংশে, 17শ শতকের তৈরী ভগবতী মা মহামায়া ও প্রভূ আদিলিঙ্গ দণ্ডেশ্বরের মন্দির দুটি পাশাপাশি অবস্থিত।
দেবী মহামায়ার মন্দিরটি পঞ্চরত্ন তথা পঞ্চ-চূড়া বিশিষ্ট। অপরটি মহাদেব দণ্ডেশ্বরের মন্দির। প্রায় 75ফুট উচ্চ প্রস্তর নির্মিত প্রাচীর বেষ্টিত মন্দির দুটি প্রায় সমান উচ্চতা বিশিষ্ট। সুবিশাল দ্বারটি "যোগীমন্ডপ" এর প্রবেশপথ।
উড়িষ্যা স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত মহাদেব আদিলিঙ্গ দন্ডেশ্বরের মন্দিরটি প্রায় 60ফুট উচ্চ চূড়া বিশিষ্ট ও প্রায় 20.6ফুট বিস্তৃত। এখানে একটি 8ফুট উচ্চ দেউল বা বিমান এবং একটি নাট মণ্ডপ রয়েছে। দণ্ডেশ্বরের মূল মন্দিরে কোন প্রতিমা দেখা যায় না। তবে এখানে একটি 4ফুট গভীরতা যুক্ত যোনিপীঠ যা প্রস্তর নির্মিত ও চক্রাকারে বেষ্টিত শিবলিঙ্গ আদিলিঙ্গ দণ্ডেশ্বর মহাদেবরূপে নিত্য পূজিত হন।
মৃল দেবী মহামায়া মন্দির
মহাদেব দণ্ডেশ্বরের মন্দিরের বাম পার্শ্বে মা মহামায়ার মন্দিরটি প্রায় 33ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট ও জগমোহনটি প্রায় 20ফুট উচ্চ ও এর মধ্যভাগটি "সপ্তরথপীড় শিখর" বিশিষ্ট যা উড়িষ্যা স্থাপত্য রীতির পরিচয় বহন করছে।
দেবী মহামায়া মসলিন শাড়ী পরিহিতা ও শতদল পদ্মের উপর আসীনা।
মাতৃমূর্তি নয়নাভিরাম ও মা মহামায়া ভক্তজনের সর্বপ্রকার মনোবাসনা পূর্ণকারিণী।
বর্তমান পরিস্থিতি
বর্তমানে দেবী মহামায়া ও দণ্ডেশ্বর মহাদেব, উভয় মন্দিরই সংস্কার ও রঙ করা হয়েছে। এছাড়া, আরও প্রয়োজনীয় সংস্কারে মন্দির কমিটি যথেষ্ট তৎপর রয়েছে।
কিভাবে যাবেন
বিমানে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোস বিমান বন্দর ও সেখান থেকে গাড়িতে এখানে আসা যাবে।
হাওড়া রেল স্টেশন থেকে বিভিন্ন মেল, এক্সপ্রেস অথবা EMU ট্রেনে মেদিনীপুর রেল স্টেশন। দূরত্ব প্রায় 128কিমি। সেখান থেকে ভাড়া গাড়িতে বা অটো রিক্সতে কর্ণগড় মন্দিরে আসা যাবে। দূরত্ব 10কিমি। গাড়ি ও অটো স্টেশন চত্বরে পাওয়া যাবে।
এসপ্লানেড বাস ডিপো, কলকাতা থেকে বাসে মেদিনীপুর বাস স্ট্যাণ্ড। দূরত্ব প্রায় 135কিমি। সময় লাগে 2.30 ঘণ্টা।
রাত্রিবাস
রাত্রিবাস করার ও রাত্রির গ্রামের দৃশ্য উপভোগ করতে এখানে আশ্রম রয়েছে। তাছাড়া, মেদিনীপুর শহরে বিভিন্ন আর্থিক মানের হোটেল পাওয়া যাবে।
নিকটবর্তী দর্শনীয় স্থান
1) মন্দির শহর পাথরা,
2) আড়াবাড়ি অরণ্যাঞ্চল
3) পরিমল কানন
4) মহাভারত বর্ণিত ভীম কর্তৃক বকরাক্ষস বধ খ্যাত গণগণির অরণ্য
প্রভৃতি।
আশা করি, লেখাটি আপনাদের ভাল লাগবে। কর্ণগড় ভ্রমণ সহায়ক হবে। মূল্যবান মন্তব্য ও বন্ধুদের নিকট লেখাটি প্রেরণ করে আমাদের উৎসাহিত করবেন। ধন্যবাদ।