Bhimbetka cave temple in Bengali - Esso Pori- Read Now

Latest

শনিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২২

Bhimbetka cave temple in Bengali

    

Bhimbetka cave temple in Bengali.



 ভীম বেটকা আদিম কালের গুহা মানবের প্রাগৈতিহাসিক আশ্রয়স্থল, জেলা রাইসিনা, মধ্যপ্রদেশ, ভারত।


‌. Bhimbetka, shelter of prehistoric age human race, district Raisina, Madhyapradesh, India.


 ভীম বেটকা বা ভীম বৈটকা বা ভীম বৈঠকা, সেকি প্রাচীন মহাকাব্যিক মহাভারতীয় পঞ্চপাণ্ডবগণের মধ্যে দ্বিতীয় পাণ্ডব মহাকায়িক ভীমের বৈঠকখানা? কথিত আছে মাতা কুন্তীদেবী সহ পাঁচ ভাই, তাদের অজ্ঞাত বাসকালে এক বৎসরকাল, এই গুহাশ্রয়ে কাটিয়ে গিয়েছেন।


  ভীম বেটকা গুহা আশ্রয় স্থলের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হল প্রাগৈতিহাসিক বিভিন্ন যুগের ধারাবাহিক ক্রম বিবর্তনের সুশৃঙ্খল বিকাশ, এই প্রস্তর ক্ষেত্রে আবিস্কৃত হয়েছে।

 

  ভীম বেটকা এলাকাটি মধ্যপ্রদেশের রাইসেনা জেলার ভোপাল শহর থেকে 45কিমি দক্ষিণে বিন্ধ্য পর্বতের দক্ষিণ ঢালে  অবস্থিত ও তার ঘন বনাঞ্চলটি প্রাণী ও উদ্ভিদ সম্পদে পরিপূর্ণ এবং এই প্রস্তরক্ষেত্রটির সাথে অষ্ট্রেলিয়ার কাকাডু জাতীয় উদ্যান(Kakadu National Park), কালাহারি মরুভূমির বুশমেন(Bushmen in Kalahari) ও উচ্চ প্যালেওলিথিক লাসকাক্স গুহার( Upper Palaeolithic Lauscaux Cave) গুহাচিত্রের সঙ্গে ভীম বেটকার চিত্র সমূহের মিল পাওয়া গিয়েছে।


  ভীম বেটকা প্রস্তর ক্ষেত্রের সুবিস্তৃত এলাকা জুড়ে প্রায় 750টি গুহা আশ্রয় স্থলের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে যা প্রাগৈতিহাসিক পুরাতন প্রস্তর যুগ (Palaeolithic Age বাOld Stone Age) থেকে ব্রোঞ্জ যুগের সূত্রপাত কাল (Chalcolithic Age বা Early Bronze Age) পর্যন্ত ক্রমশঃ স্তরে স্তরে বিকাশলাভ করেছে।


  সত্যি কথা বলতে কি, এ যেন এক গল্পগাথা, যা স্তর ভিত্তিক সাজানো রয়েছে, সেগুলি যেন, পরবর্তী সভ্য বিজ্ঞান মনস্ক মানবসভ্যতার উত্তরপুষদের জন্য, আমাদের সেই শত সহস্র বৎসর পূর্বের  পিতৃপুরুষদের নিঃস্বার্থ উপহার।


  আন্তর্জাতিক সংস্থা UNESCO কর্তৃক প্রকাশিত তথ্যসমূহ থেকে জানা যায় যে,তৎকালীন বৃটিশ আমলের এক  প্রসাশক Mr. W. Kincaid, 1888সালে স্থানীয় অধিবাসীগণের থেকে প্রাপ্ত সংবাদ অনুসারে, এই স্থানে বৌদ্ধ মঠ জাতীয় কিছু একটা রয়েছে, বলে তাঁর পাণ্ডিত্যপূর্ণ এক বিবরণীতে প্রকাশ করেন,যা প্রাথমিকভাবে তেমন গুরুত্ব লাভ করেনি।

  

  তবে পরবর্তীকালে উজ্জ্বয়িনীর পুরাতত্ববিদ পণ্ডিত পদ্মশ্রী শ্রী বিষ্ণু শ্রীধর বাকঙ্কর(V. S. Wakankar) মহাশয় এই এলাকা দিয়ে ট্রেনে করে তাঁর ভোপাল যাওয়ার সময় হঠাৎ করেই, এই প্রস্তর ক্ষেত্রের প্রতি তাঁর নজর পড়ে এবং স্পেন এবং ফ্রান্সের প্রস্তর ক্ষেত্রের সঙ্গে এর সাদৃশ্য আছে বলে তাঁর ধারণা হয়।


   তাঁর উদ্যোগে 1957সালে পুরাতত্ব বিভাগের বিভিন্ন বিশেষজ্ঞসহ তিনি এখানে হাজির হন ও তাঁর উদ্যেগে মনুষ্য বসতির প্রাচীন স্বাক্ষরবাহী কতিপয় গুহা আশ্রয় ক্ষেত্র আবিস্কৃত হয়, যার সংখ্যা বর্তমানে প্রায় 750টিরও অধিক।


  মধ্যপ্রদেশের এই সমগ্র ভীম বেটকা  অঞ্চলটি পার্বত্য অরণ্যভূমি বেষ্টিত যা বিন্ধ্য পর্বতের দক্ষিণ ঢালে অবস্থিত ও এর আরও দক্ষিণে সাতপুরা পর্বতের বিস্তৃত শৈলমালা ক্রমাগত  প্রসারিত।


  ASI প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী ভীম বেটকাতে,  প্রস্তর আশ্রয়স্থল থেকে ও বিভিন্ন খনন কার্যের মাধ্যমে, সেই সুদূর প্রাচীন গুহাবাসী আদিম মনুষ্য সমাজের জীবনযাত্রা, শিল্পকর্ম, তাদের ব্যবহৃত পণ্যদ্রব্য, চিত্রাঙ্কন পারদর্শিতা ও সেগুলির অঙ্কন সহায়ক রঞ্জক দ্রব্যাদি ও সেই দ্রব্যসমূহ সংরক্ষণ স্থান এবং ক্রমবিবর্তমান গুহাচিত্র সমূহের যে বিপুল নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে, তা সত্যই বিস্ময়কর।


  সবথেকে বড় বিষয় এটাই যে,প্রাচীন প্রস্তর যুগের প্রথম দিক(early Paleolithic age) থেকে অস্ত্য আশিউলিয়ান (late Acheulian stage) ও মধ্য প্রস্তর যুগের(middle stone age) শেষভাগ অবধি যে সময়কাল, সেই সময়ের পৃথিবীর প্রাচীনতম পাথরের মেঝে ও গুহাচিত্র সম্বলিত পাথরের দেওয়াল এখানে পাওয়া গিয়েছে।

  

  আরও উল্লেখযোগ্য যে, সেই যূগে পাথরের তৈরী অস্ত্রের মান উন্নয়নকল্পে তারা পার্শ্ববর্তী বারখেড়া অঞ্চল থেকে উন্নত মানের প্রস্তর সংগ্রহ করত, সে প্রমাণও পাওয়া গিয়েছে।


ভীম বেটকা প্রস্তর আশ্রয়স্থলটির বিস্তার প্রায় 1892হেক্টর এবং এই অধিক্ষেত্রটিকে ভারত সরকারের আইন মোতাবেক 1970সালে Archaeological Survey of India নামক সংস্থার অধীনে সংরক্ষণ ও পরিচালনার ভার অর্পণ করা হয়েছে।


  এছাড়া ভীম বেটকা প্রাচীন মানবের গুহা আশ্রয়স্থলটিকে UNESCO কর্তৃক 2003সালে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান (world heritage site) হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে।


  ভারত সরকারের সংস্থা ASI এর অভিমত অনুসারে এবং বিভিন্ন সাক্ষ্য ও প্রাপ্ত প্রমানাদির সাপেক্ষে ভীম বেটকা প্রাচীন গুহা মানবের প্রস্তর আশ্রয় স্থলটির একটি জীব বৈচিত্র্যগত ধারাবাহিকতা রয়েছে।


 ভীম বেটকা প্রস্তর ক্ষেত্রটি আদিম শিকার সংগ্রহকারী যাযাবরবৃত্তির মনুষ্যকূল থেকে কৃষিজীবী সামাজিক ও ধর্মাচরণকারী মনুষ্য সমাজের পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা আজও ঐ এলাকার অধিবাসীগণের মধ্যে প্রতিফলিত হতে দেখা যায়।


  ক্রম বিবর্তনের ধারা অনুসারে এগুলিকে নৃতত্ববিদগণ কয়েকটি যুগে ভাগ  করেছেন, যাকে ভিত্তি করে আমাদের আজকের সভ্যতার বিস্তারলাভ ঘটেছে।


   ভীম বেটকা প্রস্তর আশ্রয় স্থলে, লক্ষ লক্ষ বৎসর পূর্বেকার হোমো ইরেকটাস ও পরবর্তীকলে হোমো সেপিয়ানস্ মানব গোষ্ঠীর জীবন যাত্রার ক্ষেত্রে, যখন থেকে মানব জাতি তার বোহেমিয়ান চরিত্র থেকে বেরিয়ে এসে, আশ্রয় স্থল হিসাবে পার্বত্য গুহাকে বেছে নিয়েছিল সেই আদি প্রস্তর যুগের বহু নিদর্শন এখানে পাওয়া গিয়েছে।


  ভীম বেটকার গুহাভ্যন্তরে প্রথম প্যালিওলিথিক যুগের(old Palaeolithic age/old stone age) গুহা মানবদের দ্বারা গাঢ় লাল, সবুজ রঙ ব্যবহার করে আঁকা বাঘ, হাতি, গণ্ডার, বাইসন, রাইনোসেরাস, ভাল্লুক প্রভৃতি যেগুলির আকৃতি বৃহদাকার,তাদের চিত্র রয়েছে, যেগুলির অঙ্কনদক্ষতা ও অক্ষুন্নভাবে টিকে থাকা আজো সত্যই বিস্ময়কর।


    ভীম বেটকার গুহাচিত্রের পরবর্তী অধ্যায় হল, মধ্য প্রস্তর যুগ(mesolithic stone age), যেখানে এসে দেখা যায় যে রেখাঙ্কিত বর্ণময় ছবিগুলির বৈশিষ্ট্য ও অনেক ক্ষেত্রে বিষয়গত পরিবর্তন ঘটেছে।


  এই যুগের ছবিগুলি আকৃতিতে কিছুটা ছোট ও ঘোড়ায় চড়া যুদ্ধ অথবা শিকার যাত্রাকারী সৈন্যদল বা শিকারের উদ্দেশ্যে বার হওয়া একদল মানুষ, এছাড়া হস্তীর উপর আরোহণকারী মানুষ, বিশেষত লাল রঙে আঁকা ছবিগুলি থেকে অবশ্যই ধারণা করা যায় যে তারা বন্য প্রাণীদের পোষ মানিয়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত ও শিকারের জন্য কাজে লাগাতে শিখেছিল।


  এছাড়া, তাদের প্রস্তর নির্মিত বর্শা, তীর-ধনুক, গোষ্ঠীভিত্তিক দলবদ্ধ নৃত্য ও বিবিধ প্রকার সামাজিক ক্রিয়াকলাপ, যেমন, গর্ভবতী মহিলা, মৃতদেহের সৎকার, প্রভৃতি দৃশ্যসম্বলিত রেখাঙ্কিত রঙীন ছবি পাওয়া গিয়েছে।


  ভীম বেটকা গুহা আশ্রয় স্থলে তৃতীয় যুগ হল, তাম্রযুগের সূচনাপর্ব, যে সময় তারা কৃষিকার্যের সাহায্যে ফসল উৎপাদন করতে শিখেছিল ও সেগুলি মালওয়া সমভূমির অধিবাসীদের সঙ্গে আদান-প্রদানও করতো।


  আমরা যে যুগকে প্রাথমিক ঐতিহাসিক যুগ বলছি সে যুগে আদি মানুষেরা চিত্রাঙ্কন পদ্ধতির সৌন্দর্যায়নে আরও যত্নশীল হয়েছিল এবং তাদের লাল, সাদা,হলুদ রঙের সংমিশ্রণে আঁকা সেই চিত্রাদির মধ্যে শুধুমাত্র জীবজন্তু নয়,তাদের ধর্মীয় বোধের পরিচায়ক হিসাবে বহু ধর্মীয় চিত্র যেমন, বৃক্ষকে দেবতা হিসাবে দেখানো, যক্ষ সদৃশ কোন দেবতার মূর্তি, আকাশে উড্ডীয়মান আশ্চর্য রথ, আলখাল্লা জাতীয় ধর্মীয় পোষাক এবং এছাড়া শিকারী ঘোড়সওয়ার, বিভিন্ন লিপি ইত্যাদির প্রতীকও পাওয়া যায়।


  ষষ্ঠ ও সপ্তম পর্যায়ে বিভিন্ন ধাতু যেমন, ম্যাঙ্গানিজ, হেমাটাইট এবং চারকোল জাতীয় বস্তুসমূহ চিত্রাঙ্কনের রঙ  তৈরীর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে বটে, কিন্তু ছবিগুলির মান জ্যামিতিকভাবে সুবিন্যস্ত হলেও সেগুলি পূর্বের ছবিগুলির শৈল্পিক আবেদনের মান অপেক্ষা কিছূটা নিকৃষ্টতর বলা যায়।


  ভারতীয় আর্কিওলজিক্যাল বিভাগের নিরীক্ষণ অনুসারে ভীম বেটকা প্রস্তর গুহায় বসবাসের মধ্যে প্রাচীন কাল থেকে খৃষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দী পর্যন্ত প্রায় তিরিশ হাজার বছরের একটা ধারাবাহিকতা অবশ্যই লক্ষ্য করা যায়।


  ভীম বেটকার গুহা মানবদের শিল্পকর্ম ও সেই গুহাচিত্রগুলি অঙ্কনের ক্ষেত্রে বিবিধ রঞ্জকদ্রব্য, তাদের উৎপন্ন ও শিকারজাত পণ্যদ্রব্য ও সেগুলি সংরক্ষণের ব্যবস্থা সম্পর্কেও বহুতথ্য পর্যবেক্ষণ ও খনন কার্যের ফলে জানা গিয়েছে।


            * অডিটোরিয়াম কেভ

             (Auditorium Cave)


 ভীম বেটকার ব্হত্তম মনুষ্য আশ্রয়স্থল  কোয়ার্টজাইট পর্বতশৃঙ্গ বেষ্টিত অডিটোরিয়াম রক, যা বহু দূর থেকে পরিলক্ষিত হয় সেটিকে অবশ্যই এই ঐতিহ্যের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসাবে আখ্যায়িত করা যায়।

  

 Robert G. Bednarik মহাশয় ভীম বেটকার এই প্রাগৈতিহাসিক অডিটোরিয়াম রক শেলটারটিকে(Auditorium rock shelter)দ্বাদশ থেকে ষোড়শ শতকের গীর্জার গথিক খিলান সদৃশ ও যেন দিগন্তে উড়ে যাবার এক পার্বত্য পরিবেশ হিসাবে বর্ণনা করেছেন।


  তিনি আরও বলেছেন যে, ভীম বেটকার এই অডিটোরিয়াম রক শেল্টারটি যেন একটি সমকৌণিক যুক্ত চিহ্নস্বরূপ যা চারটি দিকে নির্দিষ্টভাবে ছড়িয়ে রয়েছে।


     * ভীমের বৈঠকখানা তথা রাজা বা দলপতির আসন।


  অডিটোরিয়াম রকের পূর্বপ্রান্তের প্রবেশ দ্বারের শেষপ্রান্তে বিভিন্ন চিত্র সম্বলিত খাড়া পর্বত গাত্রের নিকট অবশ্য উল্লেখযোগ্য, এক বিশাল চাটানো প্রস্তর খণ্ডটি,যা ভীম বেটকার তৎকালীন প্রধান বা দলপতি তথা মধ্যম পাণ্ডব ভীমের আসন নামে পরিচিত, এক দর্শনীয় বস্তু।


                   * চিড়িয়াখানা প্রস্তর 

                         (Zoo Rock)


  ভীম বেটকা প্রস্তর গুহা আশ্রয় স্থলের অপর এক আশ্চর্য প্রস্তখণ্ড হল চিড়িয়াখানা প্রস্তর, যার উপর সে যুগের চিত্র শিল্পীগণ হাতি, গণ্ডার, বাইসন, সম্বর হরিণ, প্রভৃতি জীবজন্তুর ছবি ও অপর একটিতে সাপ, ময়ূর, হরিণ, সূর্য, চন্দ্র ও বিবিধ অস্ত্রের ছবি এঁকেছিলেন, যা আজও অম্লান।


এছাড়াও এখানে রয়েছে ভল্লূক প্রস্তর, কচ্ছপ প্রস্তর, যে  প্রস্তর খণ্ডগুলির আকৃতি হুবহু ঐ সকল প্রাণীর আকৃতি স্বরূপ।

  

  ভীম বেটকা এলাকাটি, প্রাগৈতিহাসিক মনুষ্য ও তাদের চিত্রায়িত প্রাণীকূল, তার প্রাকৃতিক ও জৈবগত ধারাবাহিক বিবর্তন প্রবাহ, এখানকার অপরূপ প্রাকৃতিক পরিবেশ মূলতঃ দুর্লভ প্রাণী, গাছপালা প্রভৃতিসহ এক ব্যতিক্রমী প্রাণ বৈচিত্র্যে ভরা সংরক্ষিত অরণ্য যেটিকে পৃথিবীর জীব বৈচিত্র্যের এক জীবন্ত দলিল স্বরূপ বলা যায়।


  * নিকটবর্তী দর্শনীয় স্থান :-


  1) সাঁচী স্তূপ 2) বেগম বিহার ইত্যাদি।


  সুধী পাঠকবৃন্দ! আশা করি লেখাটি আপনাদের ভালো লেগেছে। ব্লগটির অন্যান্য লেখা পাঠের ও কমেণ্ট, শেয়ার করার অনুরোধ জানাই। ধন্যবাদ।