Dwarakadheesh Temple in Bengali - Esso Pori- Read Now

Latest

শনিবার, ১৪ জানুয়ারি, ২০২৩

Dwarakadheesh Temple in Bengali

              

Dwarakadheesh Temple in Bengali.

  Dwaraka, Gujarat, India




দ্বারকাধীশ মন্দির

       দ্বারকা শহর, গুজরাট, ভারত।

        (চতুর্ধাম তীর্থ ক্ষেত্রের মধ্যে অন্যতম এক ধাম)


  (One of the four sacred Dhams in India).

                চার ধাম বৃত্যান্ত।

 

  হিন্দু ধর্মে বিশ্বাস করা হয় যে, ভগবান ব্রহ্মা,  বিষ্ণু ও ভগবান শিব পৃথিবীতে জীব তথা মনুষ্য সৃষ্টি, রক্ষা ও বিনাশের কারণস্বরূপ, তাই ব্রহ্মার সেই সৃষ্টির রক্ষার্থে বিষ্ণু ও বিনাশে শিব, বিভিন্ন যুগে, তাঁরা অবতাররূপে ধরাধামে অবতীর্ণ হয়েছেন।


  যুগ হল, একটা নির্দিষ্ট কালব্যাপী মনুষ্যের   পৃথিবীতে বিচরণের সময়সীমা, যা বিভিন্ন শাস্ত্র ও পুরাণ মতে চারটি ভাগে বিভক্ত, ১) সত্যযুগ,২) ত্রেতাযুগ ৩) দ্বাপরযুগ ও ৪) কলিযুগ নামে পরিচিত।


 পৃথিবীতে যুগাবতার রূপে প্রভূ বিষ্ণু ও দেবাদিদেব মহাদেব যে চারিযুগে আবির্ভূত হয়েছেন সেগুলি হল, বিষ্ণু সত্যযুগে, দ্বাপরযুগে ও কলিযুগে, যথাক্রমে, সত্যযুগে বদ্রীনাথরূপে উত্তরে বদ্রীনাথ উত্তরাখণ্ডে, ত্রেতাযুগে শ্রীরাম চন্দ্র, যিনি লঙ্কায় ব্রাহ্মণ পুত্র রাবণ বধের মহাপাপ মুক্ত হতে মহাদেবের তপস্যা করেন ও রামেশ্বরমে বিষ্ণু শ্রীরাম রূপে, মহাদেবকে রামনাথেশ্বরম্ রূপে স্থাপন করেন, সেটি দক্ষিণে তামিলনাড়ুতে, দ্বাপরে পশ্চিমে গুজরাটের দ্বারকায় প্রভূ শ্রীকৃষ্ণ দ্বারকাধীশ রূপে ও কলিযুগে পূর্বে উড়িষ্যার পুরীতে প্রভূ জগন্নাথরূপে অবস্থান করেন।


  পরবর্তীকালে, 7ম-8ম শতাব্দীর আধ্যাত্মবিদ ও দার্শনিক সন্ত আদি শঙ্করাচার্য হিন্দু ধর্মে ঐ চারযুগে আবির্ভূত চার অবতারের অবস্থান স্থল চার ধামকে, হিন্দু ধর্মাবলম্বী পূণ্যার্থীগণের জীবৎকালে অবশ্য দর্শনীয় ও পূজনীয় কর্তব্যরূপে নির্দেশ করছেন।


              * ছোট চার ধাম।


  এছাড়া, আদি শঙ্করাচার্য উত্তরাখণ্ডে অবস্থিত যমুনোত্রীতে দেবী যমুনার মন্দির, গঙ্গোত্রীতে পূণ্যতোয়া দেবী গঙ্গার মন্দির(কথিত আছে, এই স্থানেই মহাদেব তাঁর জটাজাল থেকে গঙ্গদেবীকে মুক্তি দান করেন), কেদারনাথ মহাদেব ও বদ্রীনাথ এই চারটি ক্ষেত্রকে "ছোট চার ধাম" নামে পূণ্য ক্ষেত্র হিসাবে চিহ্নিত করেন। 


  কথিত আছে, উত্তরাখণ্ডে ছোট চার ধামের মধ্যে কেদারনাথ মন্দিরের ঠিক পিছনেই এই যুগপুরুষ আদি শঙ্করাচার্যের সমাধি মন্দির রয়েছে, যেখানে তিনি চির নিদ্রায় শান্তিতে শায়িত রয়েছেন।


                  * দ্বারকা ধাম।


  ভারতবর্ষের গুজরাট শহরে অবস্থিত দ্বারকাধীশ মন্দির যেটিকে জগৎ মন্দিরও বলা হয়, তা আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইণ্ডিয়ার(Archaeological Survey of India) পর্যবেক্ষণ অনুসারে, প্রায় 200খৃষ্টপূর্বাব্দে অর্থাৎ প্রায় 2200শো বৎসর পূর্বে প্রভূ শ্রীকৃষ্ণের প্রপৌত্র বা নাতির ছেলে বজ্রনাভ কর্তৃক নির্মিত হয়।


  মন্দিরের গর্ভগৃহ স্থলটি যেখানে রয়েছে সেখানেই প্রাচীনকালে শ্রীকৃষ্ণের বাসস্থান "হরি গৃহ"‌ ছিল বলে কথিত আছে এবং প্রাচীন মন্দিরটি 1472সালে মুসলিম শাসনকর্তা সুলতান মামুদ বাগেদা কর্তৃক ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় ও পুনরায় 14শ-16শ শতকে রাজা জগৎ সিংহ রাঠৌর কর্তৃক পুনর্নির্মিত হয়।


           * পৌরাণিক প্রবাদ কাহিনী।


  প্রভূ শ্রীকৃষ্ণ উত্তর প্রদেশের মথুরাতে জন্মগ্রহণ করলেও পরবর্তীকালে তিনি মাতা যশোদারাণী ও নন্দ রাজার দুলাল হিসাবে বৃন্দাবনে পালিত হন, পরে পাণ্ডব ও কৌরবগণের মধ্যে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং গুজরাটের দ্বারকাভূমিতে নিজ রাজ্যের রাজধানী স্থাপন করেন।


  একদা মহামুণি দুর্বাসা দ্বারকাতে এসে কৃষ্ণ তাঁর সহধর্মিণী রুক্মিণী দেবীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর তাঁকে রাজপ্রাসাদে নিয়ে যেতে অনুরোধ করেন এবং তাঁরা সাগ্রহে তাঁকে নিয়ে যাবার সময় পথিমধ্যে রুক্মিণী দেবী তৃষ্ণার্ত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন ও কৃষ্ণের নিকট জল খেতে চান।


  শ্রীকৃষ্ণ ভূমিতে তীর নিক্ষেপ করে দৈববলে গঙ্গাকে আহ্বান করেন ও দেবীর ত্ষ্ণা নিবারিত হয়, কিন্তু মর্ত্যলোকে প্রচণ্ড ক্রোধী বলে পরিচিত দুর্বাসামুণি এই বিলম্বের ফলে কুপিত হয়ে দেবী রুক্মিণীকে সেই স্থানেই অবস্থানের অভিশাপ দেন।


  বর্তমান রুক্মিণী মন্দিরটি যেখানে দেবী দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন সেই স্থানেই গড়ে 

উঠেছে বলে কথিত আছে।

  

         * কৃষ্ণভূমি দ্বারকার প্রাচীন ইতিহাস।


  দ্বারকা ধাম 7ম থেকে 8ম শতকে মহাসন্ত দার্শনিক আদি শঙ্করাচার্য নির্দেশিত হিন্দু তীর্থক্ষেত্র হিসাবে চার ধামের একটি হওয়ার বহু পূর্বে বৈদিক যুগে মহাভারতে শ্রীকৃষ্ণের রাজধানী এই কৃষ্ণভূমির উল্লেখ পাওয়া যায়।


  হিন্দু ধর্মে "কৃষ্ণ পরিক্রমা" বৃত্তে প্রভূ শ্রীকৃষ্ণ সম্পর্কিত তিনটি ক্ষেত্র হল, হরিয়ানার "48ক্রোশ কুরুক্ষেত্র পরিক্রমা", উত্তর প্রদেশের মথুরাতে "ব্রজ পরিক্রমা" ও গুজরাটের "দ্বারকা পরিক্রমা", যেগুলি অন্যতম তীর্থস্থল হিসাবে গণ্য হয়।


  দ্বারকা গোমতী নদীর তীরবর্তী এক প্রাচীন শহর, যা ঐতিহাসিক সময়কালে আরব সাগরের কুলে ছোট পোতাশ্রয় রূপে গড়ে উঠেছিল, যা মধ্যযুগের শেষভাগে উপকুলীয় ভূমিক্ষয়ের ফলে বিনষ্ট হয়।


            * দ্বারকাধীশ মন্দিরের স্থাপত্য ও গঠনশৈলী।


  দ্বারকাধীশ মন্দিরটি 72টি জটিল ও মনোহর খোদাই করা স্তম্ভসমূহ বিভিন্ন পৌরাণিক ঘটনা ও জীবন শৈলী সম্বলিত চিত্রাদিসহ পাঁচ তলা দেবগৃহে দুটি দরজা রয়েছে, যেগুলি হল, প্রবেশ পথ "মোক্ষ দ্বার" অর্থ পার্থিব বন্ধন থেকে মুক্তিলাভ ও নির্গমণ পথ "স্বর্গ দ্বার" অর্থাৎ অমরলোকে প্রবেশের দরজা নামে পরিচিত।


 পাঁচতলা মন্দিরটি বাহাত্তরটি কারুকার্য শোভিত স্তম্ভ ও দেওয়ালসমূহ সহ চূড়া অবধি উচ্চতা 256ফুট(78.3মি) সেই চূড়ার উপরে আরব সাগরের চপল বাতাসে দীর্ঘ 50.0ফুট(15মি) সূর্য ও চন্দ্রের চিত্র শোভিত রক্ত পতাকা উড্ডীয়মান।


  পৃথিবীতে সূর্য-চন্দ্র যতদিন থাকবে, এই মন্দির ততদিন থাকবে, মন্দিরের পতাকার পবিত্র সূর্য-চন্দ্র সেই বার্তাই প্রদান করে বলে লোকের বিশ্বাস এবং ভক্তগণের অর্থে ক্রয়করা এই পতাকা প্রতিদিন চার/পাঁচবার মহাসমারোহে  পরিবর্তন ও উত্তোলন করা হয় ও সেই অর্থ প্রভূর সেবাকার্য ,মন্দির পরিচালনা প্রভৃতি কার্যে ব্যবহৃত হয়।

  

  দ্বারকাধীশ প্রভূ শ্রীকৃষ্ণের মূর্তি, যা 'ত্রিবিক্রম নারায়ণ' তথা চতুর্ভূজ শ্রীবিষ্ণু, যেখানে প্রতিষ্ঠিত, সেই গর্ভগৃহের মূল দেব বেদিকার বামদিকে শ্রীকৃষ্ণের জ্যেষ্ঠভ্রাতা বলরামজী এবং ডানদিকে প্রভূর পুত্র প্রদ্যূম্ন ও পৌত্র অনিরুদ্ধের মূর্তি প্রত্যহ পূজিত হয়।


  মূল মন্দিরকে বেষ্টন করে অন্যান্য অনেকগুলি মন্দিরে দেবী রাধা, জাম্ববতী , সত্যভামা ও লক্ষ্মীর মন্দির রয়েছে, এছাড়া  মাধবরাইজী, বলরামজী ও মহামুণি দুর্বাসারও মন্দির এবং প্রধান মন্দিরের সম্মুখভাগে দুইটি মন্দিরের একটিতে রাধা-কৃষ্ণ ও অপরটিতে জন্মদাত্রী মাতা দেবকীর মূর্তি প্রতিষ্ঠিত রয়েছে।


  দ্বারকাধীশ মন্দিরটি এক মনোরম পরিবেশে ছোট একটি পর্বত চূড়ার উপর অবস্থিত, প্রায় পঞ্চাশটি সিঁড়ি ভেঙ্গে মন্দিরে পৌঁছাতে হয় এবং পর্বতের পাদদেশে বহমান গোমতী নদীর উপর সুদামা সেতু (যা সকাল 7.00টা-1.00টা ও বিকাল 4.00টা-7.30টা অবধি খোলা থাকে) পার হয়ে আরব সাগরের সৈকতে যাওয়া যায়।


  পুরাণ কথা অনুসারে, কথিত আছে যে, দ্বারকাভূমি প্রাচীনকাল থেকে ছয় বার সমুদ্র গর্ভে নিমজ্জিত হয় ও বর্তমানে এটি সপ্তম বার জাগরিত ভূখণ্ড বলে বলা হয়।


           * মীরা বাঈ এর কাহিনী।

  

  ভারতবর্ষের সাতটি পবিত্র শহর 'সপ্ত পুরী'র মধ্যে দ্বারকাপুরী অন্যতম, যেখানে প্রভূ নারায়ণের 98তম যুগাবতার শ্রীকৃষ্ণের রাজধানী ও বাসস্থান এবং সেই পূণ্যধামে রাজপুত রাজকন্যা, কৃষ্ণভক্ত কবি ও সাধ্বী মীরাবাঈ এর দেহান্ত হয়।


  অভিজাতবংশীয় হিন্দু অতিন্দ্রিয়বাদী ভজন গায়িকা সঙ্গীতশিল্পী ও সহজিয়া কৃষ্ণভক্তিমার্গী মীরা বাঈ(জন্ম:1498/মৃত্যু:1547) এবং তাঁর স্বামী ছিলেন মারোয়াড়ের(বর্তমান রাজস্থান) ভোজরাজ সিংহ সিসোদিয়া।


                    * ঘোষিত পুরষ্কার।


  দ্বারকাধীশ মন্দির বা জগৎ মন্দিরকে 2021সালের 22শে মার্চ আমেরিকার নিউ জার্সির World Talent Organisation নামে এক সংস্থা কর্তৃক "World Amazing Place" পুরষ্কারের শংসাপত্র প্রদান করা হয়।


              * কয়েকটি জ্ঞাতব্য বিষয় :-


  1) প্রধান দেবতা :- দ্বারকাধীশ শ্রীকৃষ্ণ।  

  2) উপযুক্ত সময় :- নভেম্বর - ফেব্রুয়ারী

  3) লকার কাউন্টার :- ফ্রী

  4) সুদামা সেতু :- প্রবেশ মূল্য Rs 10/-

  5)  মন্দির দর্শনের সময় :-     

                               7.00am-12.30pm,

                                5.00pm-9.00pm.

  6) উৎসব :- কৃষ্ণ জন্মাষ্টমী বা গোকুলাষ্টমী।

   7) স্থাপত্যশৈলী :- মরু-গুর্জর শৈলী বা চালুক্য শৈলী বা সোলাঙ্কী শৈলী যা পশ্চিম ভারতীয় স্থাপত্য শৈলী, যার উদ্ভব হয়েছিল গুজরাট ও মরুদেশীয় রাজস্থানে, যা প্রাচীনকালে গুজরাত্র ও মরুদেশ নামে 11শ-15শ শতকে চালুক্য রাজবংশের অধীন ছিল।


              * নিকটবর্তী দর্শনীয় স্থান :-


  ক) শ্রীকেশবরাইজী মন্দির, খ) বেট দ্বারকা গ) রাধা দামোদর মন্দির, জুনাগড়, ঘ) সুদামা সেতু, ঙ) আরব সাগরের সমুদ্র সৈকত, ইত্যাদি।


     * কিভাবে যাবেন :-


  # রিমান পথ :- ভারতবর্ষের অন্যান্য শহর থেকে নিয়মিত উড়ান না থাকলেও,  দ্বারকার নিকটবর্তী বিমান বন্দর হল গুজরাটের  পোরবন্দর(95কিমি) ও জামনগরের গোবর্ধনপুর বিমান বন্দর(110কিমি)।


  # রেল পথ :- দেশের সমস্ত শহর থেকে দ্বারকা রেল স্টেশনের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে।


  # সড়ক পথ :- দেশের সমস্ত এলাকার সঙ্গে দ্বারকাধাম সড়ক পথে সুপ্রযুক্ত।


  সুধী পাঠকবৃন্দ! আশা করি লেখাটি আপনাদের ভালো লেগেছে। লেখাটি শেয়ার করুন ও কমেন্ট করুন। ধন্যবাদ।