পঞ্চ কেদার পর্ব - 4
রুদ্রনাথ শৈব কেদার তীর্থ।
জেলা -চামোলি, উত্তরাখণ্ড, ভারত।
(পঞ্চ কেদার ক্ষেত্র পরিক্রমা চতুর্থ পর্ব)
ভারতবর্ষের শৈব সংস্কৃতিতে যে সমস্ত স্থানের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ্য তার মধ্যে বিভিন্ন প্রান্তের জ্যোতির্লিঙ্গ তীর্থক্ষেত্রের সঙ্গে উত্তরাখণ্ডের গাড়োয়াল হিমালয়ের পঞ্চ কেদার ক্ষেত্র বিশেষরূপে পূণ্যধাম হিসাবে বিবেচিত হয়ে থাকে।
উত্তরাখণ্ড রাজ্যকে সঠিক অর্থেই বলা হয় "দেব ভূমি" (Land of God) ও তার পঞ্চ কেদার ক্ষেত্র সমূহের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল এই তীর্থ সমূহের প্রত্যেকটি হিমালয়ের অত্যুচ্চ চূড়ায় অবস্থিত হওয়ায় যান্ত্রিক যানবাহনের সাহায্যে সরাসরি পোঁছানো যায় না, অল্প-বিস্তর পথ ট্রেকিং করে বা মনুষ্যবাহিত হয়ে বা পশুপৃষ্ঠে গমণ করতে হয়।
আজ আমরা পঞ্চ কেদার ক্ষেত্রের পরিক্রমণের নীতিতে তৃতীয় কেদার ও অবস্থানের দিক থেকে চতুর্থ শৈব কেদার তীর্থ রুদ্রনাথ, যিনি 'রুদ্র' অর্থে ভীষন, ক্রোধিত ও 'নাথ' অর্থে প্রভূ সম্পর্কে এখানে উল্লেখ করব।
কেদার ক্ষেত্র সমূহ পরিক্রমার জন্য কঠোরভাবে নির্দিষ্ট শাস্ত্রীয় বিধি অনুযায়ী আচরণীয় ক্রম ও সমুদ্র পৃষ্ঠতল থেকে উচ্চতার বিচারে তীর্থগুলির অবস্থান নিম্নরূপ :-
* ক্রম 1) কেদার নাথ : 3583মি/11,755ফূট,
* ক্রম 2) তুঙ্গনাথ : 3680মি/12070ফুট,
(কেদার ক্ষেত্র সমূহের মধ্যে সর্বোচ্চ),
* ক্রম 3) রুদ্রনাথ : 3560মি/11,500ফুট,
* ক্রম 4) মধ্যমহেশ্বর : 3490মি/11,450ফুট,
* ক্রম 5) কল্পেশ্বর : 2200মি/7200ফুট।
রুদ্রনাথ কেদার ক্ষেত্রের শিব মন্দিরে পুরাণ অনুসারে মহাদেবের মুখমণ্ডল আবির্ভূত হয়েছিল এবং সে সম্পর্কে একটি পৌরাণিক কাহিনী রয়েছে।
* পঞ্চ কেদার সৃষ্টি কাহিনী।
মহাভারত মহাকাব্যের বর্ণনা অনুসারে দ্বাপর যুগে পাণ্ডব ও কৌরবগণের মধ্যে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পাণ্ডব ভ্রাতাগণ যুদ্ধে জয়লাভ করার জন্য জ্ঞাতি হত্যা, দ্রোণ প্রভৃতি ব্রাহ্মণ হত্যা ও বহু অনৈতিক কার্যকলাপের দায়ে মহাপাপ করে এবং তার থেকে মুক্তির উপায়ের সন্ধান করতে থাকে।
মহর্ষি ব্যাসদেব তাঁদেরকে কাশীধামে গিয়ে মহাদেবের তপস্যা করার কথা বললে, পরবর্তী প্রজন্মের হস্তে রাজ্যপাট সমর্পন করে তাঁরা কাশীধামে উপস্থিত হন।
কাশীতে গিয়ে তাঁরা বুঝতে পারেন যে, মহাদেব সেখানে নাই, কারণ মহাদেব তাঁদের অনৈতিক কার্যকলাপকে ক্ষমার অযোগ্য মনে করেন, তাই কাশীধাম থেকে পলায়ন করে, হিমালয়ের গাড়োয়াল অঞ্চলে নন্দীবৃষরূপে বিরাজমান হন এবং মহাদেবের গোপন অবস্থানের কারণে এই এলাকার নাম হয় গুপ্তকাশী।
মহাদেব কাশীতে নাই একথা, পাণ্ডবগণ জানতে পারেন ও তাঁরাও গুপ্তকাশী অঞ্চলে হাজির হন ও মধ্যমপাণ্ডব ভীম দুই পর্বত শিখরে দুই পা দিয়ে, প্রভূকে সন্ধান করতে করতে নন্দীর ছদ্মবেশে তৃণভক্ষণরত মহাদেবকে চিনতে পারেন।
ভীম তৎক্ষনাৎ বৃষের পশ্চাতের দুই পা ও লেজ সজোরে চেপে ধরলে মহাদেব ভূমি মধ্যে প্রবেশ করে বিলীন হন ও পাঁচটি খণ্ডে বিভক্ত হয়ে হিমালয়ের পঞ্চ শিখরে পুনরাভির্ভূত হন।
পাণ্ডবগণ সন্তুষ্ট হয়ে ঐ পাঁচটি স্থানে পাঁচটি মন্দির স্থাপন করেন ও কেদারনাথে প্রভূর তপস্যা ও যজ্ঞ করে কৃত মহাপাপ থেকে মুক্তি লাভ করেন এবং সশরীরে মহাপ্রস্থানের পথে(কেদারনাথ থেকে ঐ পথকে স্বর্গারোহিনী বা মহাপন্থও বলা হয়) স্বর্গ গমণ করেন।
গাড়োয়াল হিমালয়ের পঞ্চ শিখরে মহাদেবের দেহের পঞ্চ খণ্ড বর্তমানে পঞ্চ কেদার শৈব তীর্থ ক্ষেত্র রূপে গড়ে উঠেছে, রুদ্রনাথ যার তৃতীয় কেদার ক্ষেত্র এবং এখানে প্রভূর মুখমণ্ডল, "নীলকণ্ঠ মহাদেব" রূপে পূজিত হয়।
* অবস্থান ও বৈশিষ্ট্য।
রুদ্রনাথ মন্দিরের অবস্থান পর্বত শিখরে হলেও এখানে বেশ কয়েকটি কুণ্ড তথা জলাধার রয়েছে, যেমন, সূর্য কুণ্ড, চন্দ্র কুণ্ড, তারা কুণ্ড, মানস কুণ্ড ইত্যাদি এবং মন্দিরের পশ্চাৎপটে দৃশ্যমান রয়েছে, নন্দাদেবী, নন্দাঘুণ্টি, দেবস্থান, হাতি পর্বত, ত্রিশূল প্রভৃতি নানান জানা অজানা বরফাবৃত পর্বত শৃঙ্গ সমূহ যা এক অপরূপ পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।
হিন্দু শাস্ত্র মতে, মোক্ষ লাভ কামনায়, মৃত্যুর পর পূণ্যতোয়া বৈতরণী নদী পার হয়ে স্বর্গধামে প্রবেশ করতে হয়, আর তাই বৈতরণী নদীতীরে পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে পিণ্ড দানের বিধি-ব্যবস্থাও শাস্ত্র মতে সমান উল্লেখযোগ্য।
কথিত আছে, রুদ্রনাথ মন্দিরের পাশ দিয়ে বয়ে চলা বৈতরণী নদীতীরে পিতৃপুরুষদের পিণ্ডদান, পবিত্র সহর গয়াতে পিণ্ডদান অপেক্ষা শত গুণ বেশী পূণ্যের, আর তাই বহু পূণ্যার্থী এখানে পিণ্ডদানের উদ্দেশ্যেও আসেন।
রুদ্রনাথ পর্বতের একটি প্রাচীন গুহাকে পরিবর্তিত করে দেব মন্দিরের রূপ দেওয়া হয়েছে এবং উচ্চ পর্বত শিখরে অবস্থিতির কারণে বরফাচ্ছন্ন থাকায় শীতকালে ছয় মাস মন্দির সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে, সেই সময়কালে প্রভূর প্রতিরূপ নিষ্ঠাসহকারে রীতি অনুযায়ী অপেক্ষাকৃত নিম্নাঞ্চলে গোপেশ্বর সহরের গোপীনাথ মন্দিরে নামিয়ে আনা হয় ও সেখানেই নিত্যসেবা করা হয়।
পুনরায় গ্রীষ্মকালের শুরুতে ঘোষিত তারিখ ও তিথিতে মহাসমারোহে প্রভূকে ডোলি যাত্রার মাধ্যমে রুদ্রনাথ মন্দিরে ফিরিয়ে আনা হয়।
ডোলি যাত্রিগণ গোপেশ্বর থেকে সাগর গ্রামের উপর দিয়ে প্রথমে, লিট্টি বুগিয়াল, পানার বুগিয়াল, এলাকা পার হয়ে পিত্রাধারে পৌঁছায় ও সেখানে পিতৃপুরুষগণের পূজা করা হয় এবং তারপর ধলবাড়ি ময়দান পার হয়ে ডোলি রুদ্রনাথে আসে, এখানে প্রথমে বনদেবীর পূজা করা হয় ও পুরোহিতগণ প্রভূর মন্দিরের দরজা খোলেন।
** বুগিয়াল :- বুগিয়াল হল, 3,000মি/10,800ফুট - 4,000মি/13,000ফুট উচ্চতায়,যা উত্তরাখণ্ডের হিমালয়ের পার্বত্য এলাকায় পশুচারণ যোগ্য ঢালু বা সমতল তৃণভূমি এবং একে এখানে "প্রকৃতির নিজস্ব বাগান"(nature's own garden) বলা হয়, অরন্যানীসহ সেগুলি সত্যই মনোহর।
রীতি অনুসারে,রুদ্রনাথ মন্দিরের পুরোহিতরা গোপেশ্বরের ভট্ট ও তেওয়ারী সম্প্রদায়ের ব্রাহ্মণরাই হয়ে থাকেন।
স্থানীয় অধিবাসীদের বিশ্বাস যে, প্রভূর অনুপস্থিতিকালে এলাকাটি বনদেবী ও দেবতাগণ রক্ষা করেন, তাই এখানে স্থানীয়দের উদ্যোগে রাখী পূর্ণিমার পূণ্যদিনে একটি উৎসব ও মেলা হয়।
* রুদ্রনাথ মন্দির যোগাযোগ ও ট্রেকিং পথ।
রুদ্রনাথ মন্দিরের নিকটবর্তী বিমান বন্দর হল, উত্তরাখণ্ডের দেরাদুন সহরে অবস্থিত জলি গ্রাণ্ট বিমান বন্দর(Jolly Grant Airport) দূরত্ব 258কিমি/160মা ও নিকটবর্তী রেল স্টেশন হল, ঋষিকেশ 241কিমি/150মা এবং ঐ দুই স্থান থেকে গোপেশ্বর ও সাগর অবধি যান বাহনের সুব্যবস্থা রয়েছে।
প্রধানতঃ রুদ্রনাথ ট্রেকিং এর তিনটি পথ রয়েছে,যার একটি হল গোপেশ্বর থেকে ট্যাক্সি যোগে সাগর গ্রাম 5কিমি/3মা(ঐ পর্যন্ত গাড়ির রাস্তা ও থাকার জন্য হোটেল রয়েছে), এরপর 20কিমি/12মা তৃণভূমি, রডোডেন্ড্রন ও ওক প্রভৃতি বনাঞ্চলের মধ্যে দিয়ে ট্রেকিং পথ অতিক্রম করতে হবে, যা কিছুটা পিচ্ছলও(slippery) হতে পারে।
দ্বিতীয় পথটি, গোপেশ্বর থেকে গঙ্গোলগাঁও 3কিমি/2মা ও সেখান থেকে 17কিমি/11মা ট্রেকিং পথ, অরন্যভূমি, পানার গ্রাম ও নাওলা পাসের কিছু মেষ পালকের কুটির সম্বলিত এলাকা পার হয়ে রুদ্রনাথ মন্দির অবধি বিস্তৃত।
তৃতীয় আরও একটি ট্রেকি্ং পথ রয়েছে গোপেশ্বর থেকে রুদ্রনাথ ভায়া মণ্ডল গ্রাম 13কিমি/8মা, সেখান থেকে 6কিমি/4মা ট্রেক করে অনসূয়া দেবীর মন্দিরে পৌঁছানো যায়। সেখান থেকে আরও 20কিমি/12মা পথ ট্রেক করে রূদ্রনাথ মন্দির।
* অনসূয়া দেবীর মন্দির ও অত্রি মূনির আশ্রম।
গোপেশ্বর থেকে অনসূয়া দেবীর মন্দির,সেখানে দেবীর এক প্রস্তর মূর্তি পূজিত হয়, সেটি মোট 19কিমি, (উচ্চতা 2000মি) তার মধ্যে মণ্ডল গ্রাম 13কিমি গাড়িতে ও বাকি 6কিমি ট্রেক করে যেতে হয় এবং দেবীর মন্দির থেকে আরও 2কিমি দূরে অনসূয়া দেবী স্বামী সপ্তর্ষির এক ঋষি মহামূনি অত্রির আশ্রম, সেখানে যাবার পথে দেখা যাবে বিশাল এক প্রাকৃতিক জলপ্রপাত যা সত্যই নয়ন মুগ্ধকর।
কথিত আছে, মাতা অনসূয়াদেবী, ট্রেকিংএর ক্ষেত্রে ভ্রমণকারী পূণ্যার্থীগণ কোন প্রকার সমস্যায় পড়লে নিশ্চিতভাবে দেবী তাকে সাহায্য করেন।
অপর একটি ট্রেকিং রুটে কল্পেশ্বর থেকে কিছুদূরে উরগাম ভায়া ডুমাক, কালগাঁত, কিমানা ও পাল্লা গ্রামের উপর দিয়ে রুদ্রনাথ যাওয়া যায়।
এছাড়া, জোশীমঠ থেকে ভায়া হেলাং 45কিমি/28মা একটি অত্যন্ত কষ্টদায়ক ট্রেকিং পথও এই রুদ্রনাথ যাত্রায় ব্যবহৃত হয়।
* কিছু জ্ঞাতব্য ও পালনীয় বিষয় :-
1) রুদ্রনাথ মন্দির শীতকালে অত্যধিক ঠাণ্ডা ও বরফপাতের কারণে নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত 6মাস বন্ধ থাকে।
2) রুদ্রনাথ মন্দিরে সকালের আরতি 8.00AM ও সন্ধ্যার আরতি 6.30PM শুরু হয়।
3) রুদ্রনাথ মন্দির ট্রেকিং পথ কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ ও দুরুহ হলেও খুবই উপভোগ্য।
4) বর্ষাকালে রুদ্রনাথ যাত্রার পূর্বে স্থানীয় অথরিটি(local authorities), ভ্রমণ সহায়ক(tour guides) অথবা ভ্রমণ সংস্থারtour operators) সহিত আলোচনা করা প্রয়োজন।
5) রুদ্রনাথ ট্রেকিং এর ক্ষেত্রে একজন ভ্রমণ সহায়ক(tour guide) থাকলে যাত্রাপথ সুগম হতে পারে।
6) ট্রেকিং পথে সঙ্গে কিছু বাড়ির তৈরী খাবার, স্ন্যাকস্ প্যাকেট(snacks), বিস্কুট, মিনারেল ওয়াটার বটল ও হাল্কা তাঁবু, দলবদ্ধ যাত্রার ক্ষেত্রে একজন স্থানীয় রাঁধুনী, থাকা প্রয়োজন।
* 7) রুদ্রনাথ মন্দির এলাকায় ছবি তোলা নিষিদ্ধ।
* 8) রুদ্রনাথে কোন হোটেল নাই, সেজন্য নিজস্ব তাঁবু বা স্থানীয় অধিবাসীর গৃহে থাকা যায়।
** 9) রুদ্রনাথ যাত্রার প্রবেশ মূল্য(security money) :-
উত্তরাখণ্ডের কেদারনাথ বন বিভাগের এক নির্দেশিকা অনুসারে, যাতে পার্বত্য পরিবেশ দূষিত না হয়, সেজন্য প্রতিটি প্লাস্টিক প্যাকেটের (plastic packet/স্ন্যাকস্ , বিস্কুট, মিনারেল ওয়াটার বোতল ইত্যাদি) জন্য Rs 100/- টাকা হিসাবে জমা রাখতে হবে ও ব্যবহৃত মোড়ক ফেরৎ দিলে সেই অর্থ ফেরৎ পাওয়া যাবে, অন্যথায় Rs5,000/- টাকা জরিমানা দিতে হবে।
সূধী পাঠকবৃন্দ! আশা করি আমাদের এই পঞ্চ কেদার পরিক্রমা পর্বগুলি আপনাদের ভালো লাগছে। পরবর্তী পর্ব -5 এর জন্য ব্লগটির প্রতি লক্ষ্য রাখুন। শেয়ার ও কমেন্ট করূন। ধন্যবাদ।