Kalpeswar Siva Temple - Esso Pori- Read Now

Latest

রবিবার, ১৪ মে, ২০২৩

Kalpeswar Siva Temple

                পঞ্চ কেদার পর্ব -5


           কল্পেশ্বর শৈব কেদার তীর্থ।


    ( পঞ্চ কেদার ক্ষেত্র পরিক্রমা পঞ্চম ও শেষ পর্ব)


  ভারতবর্ষ জুড়ে অসংখ্য হিন্দু ধর্মাবলম্বীগণের তীর্থস্থান রূপে বহু দেবদেবীর মন্দির থাকলেও হিমালয়ের উত্তরাখণ্ড রাজ্যটিকে সার্থকভাবেই  'দেবভূমি' (land of Gods) বলা হয়।


  উত্তরাখণ্ডের গাড়োয়াল হিমালয়ের পার্বত্য শিখর সমূহে অবস্থিত তীর্থ ক্ষেত্রগুলির মধ্যে পঞ্চ কেদার শৈব তীর্থগুলি ধর্মপ্রাণ হিন্দুদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ স্থল, যেখানে কেদারনাথ, তুঙ্গনাথ, রুদ্রনাথ ও মধ্যমহেশ্বর, এই চার তীর্থ ভ্রমণে কম-বেশী পার্বত্য চড়াই পথ ট্রেকিং করে অতিক্রম করা বাধ্যতামূলক হলেও, কল্পেশ্বর কেদার তীর্থ অপেক্ষাকৃত স্বল্প উচ্চতায় অবস্থিত, ফলে এখানে চড়াই নামমাত্র।


  গাড়োয়াল হিমালয়ের শিখরসমূহে অবস্থিত পঞ্চ কেদার তীর্থ সমূহের মধ্যে কল্পেশ্বর কেদার ক্ষেত্রের উচ্চতা, অন্যগুলির তুলনায় মাত্র 2,200মি/7,217ফুট, যার অধিকাংশ পথ সারা বছর যন্ত্রচালিত যানবাহনে অতিক্রম করা যায় ও কল্পেশ্বর মন্দিরটি বছরভর খোলা থাকে।


  বৃষরূপী মহাদেবের দেহের খণ্ডিত পাঁচটি অংশ পঞ্চ কেদারেরর যে পঞ্চ শিখরে পুনরায় আবির্ভূত হয়েছিল, তার মধ্যে কেদারনাথে কুঁজ তথা পৃঠদেশ, তুঙ্গনাথে সামনের দুই পা হস্তদ্বয়রূপে, নাভি ও পেট মধ্যমহেশ্বর, মুখমণ্ডল রুদ্রনাথ ও কল্পেশ্বরে  মস্তকের কেশরাশি তথা জটাজাল আবির্ভূত হয়েছিল।

  

  


    * পঞ্চ কেদার সৃষ্টির পৌরাণিক কাহিনী।


  দ্বাপর যুগে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের বিজয়ী পক্ষ পঞ্চ পাণ্ডব, যুদ্ধ করতে গিয়ে জ্ঞাতি ভ্রাতৃ হত্যা, ভীষ্ম প্রভৃতি গুরুজন ও দ্রোণসহ ব্রাহ্মণ হত্যা,এছাড়া বহুবিধ অনৈতিকতার আশ্রয় গ্রহণ করার ফলে অর্জিত মহাপাপ  থেকে মুক্তির জন্য মহর্ষি ব্যাসদেবের শরণাপন্ন হন।


  ব্যাসদেব তাঁদেরকে সেই পাপমুক্তির জন্য দেবাদিদেব মহাদেবের তপস্যা করার জন্য কাশীধামে গমণ করার উপদেশ দেন।


  মহাদেব পাণ্ডবদের কৃত মহাপাপ ক্ষমা করতে সম্মত ছিলেন না, তাই তিনি কাশীধাম ছেড়ে বৃষরূপী নন্দীর রূপ ধরে হিমালয়ের বর্তমান গাড়োয়াল অঞ্চলে বাস করতে থাকেন, তাঁর এই গোপন অবস্থানের জন্য ঐ এলাকার নাম হয় গুপ্তকাশী।


  পঞ্চ পাণ্ডব কাশীধামে উপস্থিত হয়ে বুঝতে পারলেন যে, মহাদেব কাশীতে নাই, তাঁরা ঘুরতে ঘুরতে গাড়োয়াল এলাকায় এসে প্রভুর সন্ধান করতে থাকেন এবং মধ্যমপাণ্ডব দুই পর্বত শিখরে দুই পা দিয়ে তৃণ ভক্ষনরত নন্দীরূপী মহাদেবকে চিনতে পারেন ও সজোরে তাঁর লেজসহ পিছনের দুই পা চেপে ধরলে মহাদেব ভূমিতে বিলীন হন ও পাঁচটি খণ্ডে বিভক্ত হয়ে হিমালয়ের পঞ্চ শিখরে পুনরাভির্ভূত হন।


  পাণ্ডবগণ সন্তুষ্ট হয়ে ঐ পঞ্চ শিখরে মহাদেবের পাঁচটি মন্দির তৈরী করেন, যা কালক্রমে পঞ্চ কেদার শৈব তীর্থে পরিণত হয়, পাণ্ডবগণ শিখরগুলিতে মহাদেবের পূজা করেন ও কেদারনাথে তপস্যা ও হোম যজ্ঞ করেন, অবশেষে তাঁরা পাপমুক্ত হয়ে স্বর্গে গমণ করেন, কেদারনাথ থেকে  মহাপ্রস্থানের সেই পথকে "স্বর্গারোহিনী" বা "মহাপন্থ" বলা হয়।


   * কল্পেশ্বর কেদার ক্ষেত্র সম্পর্কে আরও কয়েকটি প্রবাদ কাহিনী।


  কল্পেশ্বর তীর্থ ক্ষেত্রটি প্রাচীন কাল থেকে ঋষিগণের আদর্শ সাধনক্ষেত্র হিসাবে বিবেচিত হত,আর কথিত আছে এখানে তপস্যা করে মহাঋষি অর্ঘ্য তাঁর সাধনা বলে দেবলোকের প্রবাদ প্রতীম অপ্সরা নর্তকী উর্বশীকে সৃষ্টি করেছিলেন।


  অপর এক প্রবাদ কাহিনী হল, মহাদেবের অবতার হিসাবে কথিত ঋষি অত্রি ও অনসূয়া দেবীর পুত্র মহা ঋষি দুর্বাসা এখানে মন্দিরের সন্নিকটে অবস্থিত "কল্প বৃক্ষের" নীচে বসে কঠোর তপস্যা করেন।


    * কল্পেশ্বর কেদার মন্দির ও কিছু তথ্য। 


  হিমালয়ের গাড়োয়াল অঞ্চলের 2200.00মি/7217.8ফুট উচ্চতায় মনোরম পরিবেশে উরগাম উপত্যকায় অবস্থিত পঞ্চম তথা শেষ কেদার তীর্থ কল্পেশ্বর শিব মন্দির প্রাচীন মহাকাব্যিক পুরাণ গাথার সঙ্গে বিজড়িত এক হিন্দু শৈব তীর্থক্ষেত্র হিসাবে বিশেষ স্থান লাভ করেছে।


  উরগাম উপত্যকায় দুটি নদী অলকানন্দা ও কল্পগঙ্গা একসাথে মিলিত হয়েছে।


  কল্পেশ্বর কেদার ক্ষেত্রটি প্রথমতঃ অন্যান্য চারটি তীর্থ,যথাক্রমে, কেদারনাথ, রুদ্রনাথ, তুঙ্গনাথ ও মধ্যমহেশ্বরের গমণ পথ প্রথমতঃ বিশেষভাবে কষ্টসাধ্য ট্রেক করে যেতে হলেও, এখানে সে পথ খুবই স্বল্প দৈর্ঘ্যের এবং দ্বিতীয়তঃ সেই কেদার ভীর্থগুলি উচ্চতার কারণে ছয় মাস মূল মন্দির বন্ধ থাকলেও এই কেদার তীর্থটি সারা বছর খোলা থাকে ও সহজে গমণযোগ্য।


  পুরাণ কথা অনুযায়ী, মহাদেবের শরীরের পাঁচটি খণ্ডের মধ্যে কল্পেশ্বরে প্রভূর জটা আবির্ভূত হয়েছিল বলে কথিত আছে, তাই এই তীর্থে শিবের জটাজাল দেব রূপে পূজিত হয়ে থাকে ও এই মন্দিরে অর্চিত দেবতা মহাদেবকে "জটাধর" বা "জটেশ্বর" নামে অভিহিত করা হয়।


  অতীতে তীর্থ ক্ষেত্রটি হেলাং (ঋষিকেশ - বদ্রীনাথ রাস্তার উপর) থেকে দীর্ঘ 12কিমি/7.5কিমি পথ ট্রেক করে যেতে হলেও বর্তমানে দেবগ্রাম অবধি অর্ধেক বাঁধানো রাস্তায়, যা বর্ষাকাল ছাড়া ছোট গাড়ি বা বাইক করে যাওয়ার পর অবশিষ্ট কিছুটা অংশ সুড়ঙ্গপথসহ, কিছুটা পথ ট্রেক করে যেতে হয়।


  কল্পেশ্বর শিব মন্দির হিমালয়ের উরগাম উপত্যকায় উরগাম গ্রামের সন্নিকটে (মাত্র 2কিমি/1.2মা পথ) অবস্থিত।


  উরগাম উপত্যকাটি গভীর জঙ্গলাকীর্ণ, মাঝে মাঝে বসতি এলাকায় আপেল বাগান ও ধাপ পদ্ধতিতে প্রচুর পরিমাণে আলুর চাষ হয়ে থাকে।


  কল্পেশ্বর ট্রেক রুটে  পড়বে বুদ্ধ কেদার মন্দির ও উরগামে অবস্থিত সপ্ত বদ্রীর অন্যতম "ধ্যান বদ্রী" মন্দির।


   * কল্পেশ্বর মন্দিরের পুরোহিত ও পূজা প্রকরণ।


  অষ্টম শতকের অদ্বৈতবাদী হিন্দু দার্শনিক আদি শঙ্করাচার্য প্রদর্শিত পূজা প্রকরণ ও রীতি-নীতি এবং পুরোহিত নির্বাচন, অন্যান্য কেদার মন্দিরের মতই একই পদ্ধতিতে হয়ে থাকে।

  (পূর্ববর্তী 1ম-4র্থ খণ্ড কেদার তীর্থ পরিক্রমা দ্রষ্টব্য)


  কল্পেশ্বর ও রুদ্রনাথ মন্দিরের পুরোহিতগণও আদি শঙ্করাচার্যের নির্দেশিত পথে তাঁরই শিষ্যকুল, দশনামী ও গোঁসাই সম্প্রদায় থেকেই হয়, যদিও তুঙ্গনাথ মন্দিরের পুরোহিতগণ দক্ষিণ ভারতীয় খাসিয়া ব্রাহ্মণ, কেদারনাথ মন্দিরে মহীশূরের জঙ্গম গোত্রীয় সেবাইতগণ পূজা পদ্ধতির কার্য করেন।


         * পঞ্চ কেদার দর্শণের পর পূণ্যার্থীর পালনীয় কর্তব্য।


  শাস্ত্রের বিধান অনুসারে পঞ্চ কেদার তীর্থ ভ্রমণকারী পূণ্যার্থীর সর্বশেষ কেদার, কল্পেশ্বর মহাদেবের দর্শন ও পূজনের শেষে বদ্রীনাথ ধামে প্রভূ বিষ্ণুদেবের দর্শন ও পূজন অবশ্য পালনীয় কর্তব্য, যা না করলে  কেদার তীর্থ ভ্রমণ সম্পূর্ণ হয় না।


  কারন হিসাবে বলা হয়ে থাকে যে, এর দ্বারা ভক্ত, সর্বপাপহারী নারায়ণকে জানায় যে প্রভূ মহাদেবের নিকট থেকে সে তাঁর আশীর্বাদ গ্রহণ সম্পূর্ণ করেছে, এবার নারায়ণ তার চরম প্রার্থনা পূর্ণ করুন।


                        * কয়েকটি জ্ঞাতব্য বিষয়।


  * প্রধান দেবতা :- কল্পেশ্বর মহাদেব।

  * উৎসব :- মহাশিবরাত্রি।

  * মন্দির খোলা ও বন্ধের সময় :-

       খোলা- সকাল 06.00am

       বন্ধ - রাত্রি 08.00pm

  * সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা :- 2200মি/ 7,217ফুট।

  * কল্পেশ্বর কেদার শিব মন্দির সারা বছর খোলা থাকে।

  * উপযুক্ত সময় :- এপ্রিল, মে, জুন, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর। তবে বর্ষাকালে প্রচুর বৃষ্টিপাত ও শীতকালে তাপমাত্রা 4ডিগ্রীতে নেমে যায়। ফলে সাবধানতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।

  * কল্পেশ্বরে রাত্রি যাপনের জন্য মন্দির এলাকায় একটি ধর্মশালা আছে, তাছাড়া স্থানীয় অধিবাসীদের গৃহে(home stay) বা তাঁবু(tent) খাটিয়ে রাত্রিবাস করা যায়।

  * ঐ এলাকার অন্যান্য ঐতিহাসিক  মন্দির ও অন্যান্য বৃক্ষ, কুণ্ড ইত্যাদি :- কেদার দেউল, গোরা দেবী দেউল,  নন্দী নাগকথা, বিশ্বকর্মা মন্দির, ঘণ্টাকর্ণ মন্দির, নন্দাদেবী মন্দির।

   এছাড়া কল্প বৃক্ষ, ইন্দ্র ধারা, অমৃত কুণ্ড ইত্যাদি।


                         * কি ভাবে যাবেন।


  কল্পেশ্বর যাবার ক্ষেত্রে নিকটবর্তী বিমান বন্দর হল দেরাদুন শহরে অবস্থিত জলি গ্রাণ্ট(Jolly Grant), যার দূরত্ব মোটামুটি 272কিমি/169মা এবং নিকটবর্তী রেলস্টেশন হল ঋষিকেশ শহর, যার দূরত্ব আনুমাণিক 255কিমি/158মা এবং  উল্লিখিত উভয় স্থান থেকেই বাস অথবা ভাড়ার গাড়ি পাওয়া যাবে।


  সুধী পাঠকবৃন্দ! আমাদের এই ব্লগে প্রকাশিত পঞ্চ কেদার তীর্থ পরিক্রমার পাঁচটি পর্ব আপনাদের কেমন লাগল, কমেণ্ট করে জানান ও প্রচুর শেয়ার করুন, এই অনুরোধ জানাই।